চাবি
সেই বরফমাখা রাতের কথা মনে পড়ে। আমেরিকা পৌঁছনোর প্রথম সপ্তাহান্তে একদিন নিজের ঘরের বাইরে আটকা পড়লাম, চাবি ভুলে রইল ভিতরে। সেদেশের পরিভাষায় “লকড্ আউট”। ঠিক যে মুহূর্তে চোখের সামনে দরজাটা নিজে হাতে বন্ধ করলাম, তার ঠিক সাথে সাথে বুঝলাম এই ভুলের দায় আমার, একমাত্র আমার। এবং ভিনদেশে এরপর থেকে যত ভুল করব, যা যা ভুলে যাব, যেভাবে পরিত্রাণের উপায় বের করব- তার সবটারই কেন্দ্রে রয়েছে এক আমি। যে ‘আমি’ বিশাল, অথচ মহাকালের বিশালতার কাছে তার অবস্থান ক্ষুদ্র। মানুষের মন যখন গড়া হচ্ছিল, প্রবৃত্তির সাথে সংযোগ তৈরীর জন্য অযুত অ্যাম্পিয়ারের কানেকশনও তৈরী হচ্ছিল ঠিক তার পাশে। জন্মের পর থেকে প্রথম বুলি, প্রথম হাঁটতে শেখা, প্রথম কান্নার পাশে ‘আমি’-র নির্মাণ হয়, ঐ এক চিলতে মানুষ ক্রমশ বড় হতে হতে নিজেকে প্রাধান্য দিতে শেখে। অপরকে আপন করার আগে ‘আমি’-কে বেছে নেয়; তার জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়ে, বিক্ষিপ্ত বাল্বের আলোর ঝলকানিকে সর্বস্ব ভেবে সমস্ত ‘আমি’-রা ভুলে যায় বোধির আলোকের জন্যে অপেক্ষা করতে।
আমেরিকা আমার
নিজের দেশ ছিল না, হওয়ানর কোনও অভিপ্রায় ছিল না। বিশ্বাস করি, ভিটে ছাড়া বিশ্বের যে
প্রান্তেই মানুষ থাকুক, অতীত তার সাথেই থাকে। অনেকের বোঝা হয়ে থাকে, অনেকে সেই বোঝা
সফলভাবে সে বোঝা নামাতে পারে। মানুষের নিজের দেশ, নিজস্ব পরিমণ্ডল তাকে যদি প্রার্থিত
জীবনকাঠামো দিত, তবে সে কেন ঘরছাড়া হতে চাইবে? তাই তো পরদেশে চেনা ভাষার মানুষ দেয়
প্রাণের আরাম। মাতৃভাষা কানে এলে মনে হয়, আসলে আমি ততটা একা আর নই তো।
ক্লাস
শেষ করে মিশিগান থেকে শিকাগোগামী বাসে চেপেছি। বিকেলের আকাশ থেকে সেদিন অঝোরে বরফ ঝরে
পড়ছে। ফেনিল এক সমুদ্রের শুভ্রতার মধ্যে দিয়ে বাস চলেছে, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এ যাত্রা
যেন অনন্তকাল চলবে। ওপার অবধি, অথবা তারও পরে। প্রথমবার বাস দাঁড়াতে সম্বিৎ এল, বিশ্বাস
হল, বেশ তবে হয়তো তুষারঝঞ্ঝা গন্তব্য ভুলিয়ে দেয় না। নামলাম। দশ মিনিট দাঁড়াবে এই গ্রেহাউণ্ডের
বাস। অনেকে নেমে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবে, বরফ উপেক্ষা করেই। নতুন লোক উঠবে।
জাপটে ধরা জ্যাকেট, গ্লাভস ছাড়া এক পা দাঁড়ানো যাচ্ছে না। গোড়ালি পেরিয়ে বরফস্তর রাস্তায়।
তাই ডিঙিয়ে দাঁড়াতে এবং আমার উদ্দেশ্য বোঝার সাথে সাথে এক প্রৌঢ়া নিজের প্যাকেট থেকে
সিগারেট সাধলেন। সদাবিনয়ী দেশের ছেলে আমি, সাধলে আগে না বলে তারপর সাগ্রহে ‘হ্যাঁ’-কেই
ভদ্রতা বলে জেনেছি। কিন্তু এদেশে আসার কিছুদিন পর থেকে বুঝেছিলাম, এখানে বিনয়ের পরিসর
একচিলতে, না বললে প্রথমবারেই, হ্যাঁ-এর ক্ষেত্রেও তাই। অতএব পোলিশ প্রৌঢ়াকে হ্যাঁ বলা
হতে না হতেই বরফধোঁয়ার মধ্যে মিলিয়ে যেতে লাগল বিষধোঁয়া। আর সেটুকু দৃশ্যমানতা বিলীন
হওয়ার আগে তিনি জানালেন, দূরদেশে থেকে নিজের ভাষাভাষী মানুষকে না পেয়ে তাঁর স্বযাচিত
আমি-ও কেমন তিলে তিলে হারিয়ে যাচ্ছে। আর এই হারিয়ে যাওয়াকে তিনি কোনও উপায়ে প্রতিহত
করতে পারছেন না।
আসলে অনেকেই ভালো নেই, দূর থেকে, আড়ম্বর দেখে বিভ্রম
হয় দারুণ ভালোর এই তো প্রতিরূপ। আসলে চাওয়ার তালিকা যত দীর্ঘ হচ্ছে, আমি যত হয়ে উঠছে
প্রিয়, ততই মানুষের ভালো না থাকার সোহাগ বাড়ছে। যদি এমন হত, পৃথিবীর প্রত্যেক জীব নিজেকে
ছাপিয়ে পৃথিবীকে দেখছে- এক আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে প্রত্যেকে ঐকতানে বলছে, “জানি, জানি
আমি নগণ্য। জানি জাগতিককে পরমার্থ করে আদতে আমি নিজেকেই করেছি অপমান”। ‘ফোর্ড ভি ফেরারী’
ছবির বাবা-ছেলের সেই অমোঘ দৃশ্যটির কথা বরফ ঝরার সাথে সাথে মনে পড়ে। দৃষ্টি আছে সবার,
অন্তর্দৃষ্টি; তবু জগৎজোড়া মানুষ দেখতে পায় না। তার চেয়েও বেশী দেখতে চায় না। সামনের
বাঁকটি দেখে শুধু, দৃষ্টিকে উন্মুক্ত করে সব পাকদণ্ডী শেষের দিগন্তের দিকে দুটি হাত
তুলে দিতে পারে না।
পুণ্যের প্রবাহ বেয়ে প্রবাসে প্রাণমানুষদের সান্নিধ্য পেলে
তাকে অবজ্ঞা করার ধৃষ্টতা দেখানো অপরাধ। তেমন মানুষদের চিনে মনে হয়েছিল এমনতর ভালোমানুষ
আছে বলেই বিশ্বসংসার ছলনা আর আত্মকেন্দ্রিকতায় সর্বস্ব খুইয়ে বসেনি। মধ্যরাতে ঘুম উপেক্ষায়
তাদের উপস্থিতিকে আত্মসাৎ করতে চাইতাম, যতটা পারা যায়। জানতাম, এই মানুষদের সাথে আবার
কবে দেখা হবে তার ইয়ত্তা নেই। সঙ্গলাভের চাতক হয়ে তাদের অতল অমৃতপাত্রে ঢিল ফেলতে থাকতাম।
প্রবাসী শিরশিরানি সহযোগে ঐ প্রত্যেক মুহূর্তের কথা পারের ঢেউ হয়ে পা ভিজিয়ে দিয়ে যায়।
শত শত মাইল পেরিয়ে আসার রাস্তাটা মনে পড়ে। মনে পড়ে ন্যাশনাল পার্কে তাঁবুর তলায় পিঠের
তলা দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের ধারা- নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে।
দেশ কাল জুড়ে প্রভূত প্রাচুর্য নিয়ে স্বয়ংসম্বলিতভাবে কোনও
প্রদেশ মহৎ হয় না। মহৎ হয় মানুষ। ভালো মন সম্বল করে সে গাছের মতো ছায়া দিতে শেখে। রোদের
তেজ যত বেশী হয়, ছায়ার স্নিগ্ধতা হয় তত মোহময়। গাছ আকারে যত ছোট হোক, ছায়া দিতে পারাটুকুই
শিক্ষা। বাহিরের চাবি অনেক হারাবে, অন্তরের চাবি হারানোর নয়, কেবল ঠিক তালাটি খুঁজে
বের করার।।
ছবি সূত্র: দ্য হলিউড রিপোর্টার
Comments
Post a Comment