Posts

একটা একটা চিঠি

  প্রিয় আমি, তোমাকে রোজ নতুন করে চিনি, আবার অচেনা লাগে বড়। তোমার সদর দফতরে দরখাস্ত করে রেখেছি, যাতে তুমি তাল মিলিয়ে চলো। তারপরেও দেখি তাল কেটে যায়। অকূল দরিয়ায় তোমাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, তুমি তখন অপর পাড়ে খুব জোরে দাঁড় বাইছ। আমার স্রোতের অনুকূল আর তোমার স্রোতের প্রতিকূল একাকার হয়ে যায়। তোমায় হারিয়ে ফেলে হাতড়াতে হাতড়াতে বুকের তন্ত্রীতে বেদনা ভিড় করে আসে। সে বেদনা থেকে মুক্তি চাইতে গিয়ে দেখি, এ বাঁচার বেদনা আছে বলেই তোমার আমার এহেন সহৃদয় লড়াই টিকে আছে। তুমি চাও না লড়াই ফুরোক, আমি পারি না আর লড়তে। কী মধুর, কী নির্মম এই বিনিময়।  একবার ভাবি তোমাকে ছেড়ে দেব। কিন্তু তোমাকে ছেড়ে গেলে আমার পড়ে থাকবে কি কিছু? তোমাকে আমি তৈরী করলাম নাকি তুমিই আমায় তিলে তিলে গড়লে- সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সন্ধে নেমে আসে। অন্ধকার ঘনালে তুমিই যে আমার আলো। তুমি আমায় যত আলো দিয়েছ, তার তিলমাত্র টুনি তোমাকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। কখনও একেবারেই ভুলে গেছি তোমার লালন। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বলেছ তুমি, এই যে দ্যাখ আমার দিকে, আমি নেই এমনটা হয় না। আমি খুব আছি, তুই ভুললি বলে আরও বেশি করে আছি। আমি তো আর কিছু চাই না, চাই চোখ মেলে ত...

একটা একটা চিঠি

 প্রিয় আক্ষেপ, এখনও রোদ পড়ে আসেনি বটে। এখনও বুঝি খানিক জ্বলন, খানিক প্রার্থনা বাকি। মানুষের মুখে তোমার নাম দেখি সমস্ত প্রার্থনায়, বলে, জীবনে তখন মানুষের কাজ করার ছিল, করা হল না। আপন সংগ্রামে বুঁদ হয়ে থাকার ছিল, সেটিও হল না। হল কী? কেবল আত্মকে বিলিয়ে দিয়ে অন্বেষণের রাস্তা ভুলে যাওয়া। আর ভুলে যাওয়া পথে তোমাকে মনে করা, কেবল মনে করা সেই আগ্রহে যাতে সূর্যাস্তের সময়তেও আলোর মৃদুতার দিকে তাকিয়ে বলা যায়, করা হল না কিছুই। দেওয়া হল না মোটে। মানুষের আবির্ভাব আকস্মিক। পরিশেষটির আভাস পেলেও দিনক্ষণ মূলগতভাবে আকস্মিক। দুইয়ের মাঝে পর্বটুকুতে শত ঝকমারি। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, পড়ে যাওয়া, অন্তর্বাসিনী প্রকল্পকে এড়িয়ে গিয়ে বহির্বাসিনীর তরে যৌবন-প্রৌঢ়ত্বের বিসর্জন। মাঝে মাঝে তোমাকে স্মরণ। একটি শিশু ফুলের মতোই জন্মাল। তারপর তাকে ঝড়ের ঘন কালো রাতে একা ছেড়ে দেওয়া হল। আশঙ্কা হল, রোমাঞ্চ হল, তাকে বড় হতে দেওয়া হল। কখনও এক মুহূর্তেই মানুষ হয়ে যায় অনেকটা বড়। আবার, অনেক বড় হয়েও সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, গুলিয়ে ফেলে। সে নতুন ফুটে ওঠা কুঁড়ির দিকে তাকিয়ে তাকে ইচ্ছেমতো বেড়ে ওঠার সাহস জোগাতেও পারে না- আকস্মিকতার করাল...

কথায় কথায় কাশ্মীর

Image
প্রথম দর্শনে ডাল লেক (১) বিশ্বভ্রমণের আহ্লাদ জাগে মনে, 'আগন্তুক'-এর উৎপল দত্ত হতে অন্তর ওঠে চেয়ে, কখনও সখনও। বেড়াতে যাওয়া মানে শুধু মজার অতিবাহনে উল্লাসকর ক্ষণিকযাপন নয়। নিজেদের সীমিত পথটুকু পেরোলেই নতুন কিছুকে পাওয়া যায়; তা মন্দ অথবা ভালো, কৃতীময় অথবা দুষ্কৃতীময়, জঘন্য বা অমোঘ। আপন কূপের বাইরে মহাসাগরে ঝুপ করে গিয়ে পড়তে পারলে অনিশ্চয়তার ভ্রূকুটি যেমন থাকে, তেমনই অজানাকে সবিস্তারে জানার এক সম্ভাবনা তৈরি হয়। অনিশ্চয়তার ভীতির তুলনায় সম্ভাবনার রোমাঞ্চ অনেক বেশি আকর্ষণীয়। বিশেষ করে যারা অজানার হাতছানি শুনতে পেয়েও গৃহী পরিসরে বাঁধা পড়ে আছে। ভ্রমণের মধ্যে যে অনুচ্চারিত আলস্য আছে, আসলে তা সকলের জন্য সমান নয়। অনেকের জন্যই বেড়াতে যাওয়া মানে নিজেকে চেনা, হারানো আমি-কে হাতড়ানোর উপায়। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েও ধ্যানসর্বস্ব হওয়ার হদিশ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাস্তবায়িত কাশ্মীর ভ্রমণে শ্রীনগরের মাটি ছুঁয়ে দূর পাহাড় থেকে বয়ে আসা প্রথম বাতাসী ঝলক চোখে-মুখে প্রথম লাগল যখন, অনেকদিন বাদে প্রকৃতি-সমীপে মুক্তি পেয়েছি বলে মনে হল। আমি জানি, এই কাশ্মীর আসা একক মগ্নতায় সংসার-বিচ্ছিন্ন চেতনা নিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফে...
Image
বিশেষ হয়ে রহ      যে সিনেমা, যে কাহিনী শান্ত করে, তার কাছাকাছি বসে বেশ উঠতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় থাকুক আর কিছুক্ষণ। বসি আরেকটু। খুব বিদ্বেষী, বিরাগী, অনুভববিহীনতার মধ্যে শিল্প যে সম্পর্কের অনন্ত দিককে আজও ছুঁতে চাইছে, আজও হৃদয়ের কথা বলা গল্পের প্রেরক ও গ্রাহক দুইই যে আছে, সেকথা আবার জেনে মনে হয় আবার বেঁচে উঠি। কোরিয়ান ছবি পাস্ট লাইভস (২০২৩) [ পূর্ব জনম ] সম্পর্কের অতি সামান্য এক গল্পকে বলার ঢঙের আত্মবিশ্বাসে উচ্চমার্গে নিয়ে চলে গেল। যেন ছবির সমস্ত কুশলী দেখিয়ে গেল পৃথিবীতে ধৈর্যের স্থান কতটা অটুট। এই ছবি বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার দ্বন্দ্ব নিয়ে মাথা ঘামায় না, দর্শককে চমকে দিতে চায় না, অবিশ্বাসীও করতে চায় না। শুধু চায় মগ্নতা, শুধু দাবি করে কাহিনীর বুননের মাঝেই নিজের মনের দিকে কয়েক পলক তাকানো হোক। মনে করায়, মানুষের একটা জীবন হল অসংখ্য অভাবনীয় স্তরের, প্রচুর জানালার, কী হতে পারত, কী হল না, কী থেকে কী হল-র চিত্রকল্প। তাই আপাতভাবে মানবজীবনকে মলিন, একঘেয়ে লাগলেও একটাই মানুষ অনেকগুলো গল্পের মুঠি ধরে থাকে। কোনওটাকে এতটাই চেপে ধরে থাকে যে সেটি জীবন জুড়ে ফুটতে পারে না, আবার কোনওটা ম...
Image
 অবিশ্বাসী বিপ্লবের অচেনা পথ শেষবার পথ হেঁটে এসে শুরুটা আবার দেখতে চাই। কান্নার দমক ফুরোলে পর হাসিবিশ্বে বিলীন হতে চাই। মানুষকে যত দেখি তত অবাক হই। মলিন মুখে কষ্টের মুহূর্তদের একজায়গায় করে কত মানুষই না বেঁচে আছে। বাহাত্তর বছর পর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কেউ যদি বলতে পারে, আমি ওপারে পৌঁছে অপার হতে চেয়েছিলাম- তখন সে জানবে এবার ফুরিয়েছে বেলা। এবার আর খুশি করার দায় নেই, সুখী বানাবার বাধ্যতা নেই। এবার আর কিছুই নেই যেন- মহাশূন্য, মহানির্বাণ।  এবার পৃথিবীর চাই একটা আন্দোলন, সমস্ত ভাঙা ভাঙা আন্দোলন জুড়ে নিয়ে একটাই আন্দোলন ঐক্যের একটিমাত্র বাণী- সে আন্দোলন সত্যের। সত্যাগ্রহ থেকেও কেবল সত্যটুকু ছেঁকে নিতে ইচ্ছে করে। সত্যের মহান্দোলনে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সত্যি কথা বলবে, সত্যকে খুঁজবে। প্রাপ্তবয়স্ক অপ্রাপ্তকে বোঝাবে তার গন্তব্যে আপন সত্যাবিষ্কার হল সর্বাগ্রে; তার জন্য সে আপনতরকেও ছেড়ে যেতে পারে, গেলে তাকে কেউ দাগিয়ে দেবে না। তোমার সত্যের সঙ্গে আমার সত্য মিলে যাবেই বলে ধরে নেবে না। বরং না মিললেই জানা যাবে সত্যপূজার মর্মার্থ। বীজমন্ত্র 'সত্য'- সুন্দর হোক অথবা অসুন্দর। রোজই কত মিথ্যে জিত...
Image
 মোরে আর দিও না প্রাণ ঘন অন্ধকার সে রাতে বাচ্চাটা স্বপ্ন দেখেছিল সাধারণের ভিড়ে দাঁড়াবে না কখনও। জীবনাবর্তের প্রকার নিয়ে জীবনকথকরা অনেকবার বলেছেন, এ ভাবগতিক বড় ভ্রমাত্মক, এভাবে মাপজোক করে চলতে চলতে একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে সব, নেওয়া বা রাখা- হবে না কোনওটাই। তেমন অবান্তর আলেখ্য জেনে ও ভুলে গিয়ে মানুষ প্রজনন ঘটায়, নিজের অপারগতা ঢাকতে নতুন প্রাণ এনে তাকেও অপারগ করে তোলার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। স্বপ্ন দেখা বাচ্চাটা তাই শেষ অবধি লাইনে এসেই দাঁড়াল। এমন দাঁড়িয়ে পড়ায় মানুষ জেতে, মানবতা নয়।      ধরাতে বাচ্চাদের ধরা পড়ার দায়টা কোথায়? তারা আসবে কি আসবে না, এ নির্বাচন তাদের হাতে নেই। হ্যাঁ, মানবজীবনের মেঠো রসে সিক্ত হওয়া এক সৌভাগ্যের ব্যাপার বটে। কিন্তু ক'জনের হয় সে সৌভাগ্য? সৌভাগ্য আর বিলাসিতার মাঝে সমান সমান চিহ্ন বসানো মানুষ তার সন্তানকে বোঝাতে পেরেছে যে, কুক্ষিগত চিত্তে আপনমগ্ন হয়ে থাকাকেই সার্থক মানবজীবন বলে। এই বহমান প্রকল্পকে সঙ্গী করেই আমরা একের পর এক প্রজন্মকে অপরিবর্তিত ধারাবিবরণী শুনিয়ে গেছি। তারপর পিলপিল করে বাচ্চারা যুদ্ধে মরে গেছে। অথবা না খেতে পেয়ে। জন্মদাত্রী-দাতাদের রোগ ...
Image
লড়াই রাজা চার্লি চ্যাপলিন ছোটবেলায় এক ট্রুপে মঞ্চানুষ্ঠান করতেন। অনেক ট্রুপেই করেছেন ,  তার মধ্যে একটিতে জারমো নামের একজন ছিলেন কৌতুকাভিনেতা তথা জাগলার। সেসময়ে ট্রুপে গীতিনাট্য , কৌতুক , মূকাভিনয় , সার্কাসে অংশীদার হয়ে সঙ সাজা- সবেরই পসরা সাজানো থাকত। মানুষের কখন কোনটা ভালো লেগে যায় , কখন কীসে সে বিনোদনরস পায় ; তাই আয়োজন থাকত বিবিধ। যাতে প্রত্যেক দর্শক হাসিমুখে , ভরা মনে বাড়ি ফিরতে পারে। চ্যাপলিন তাই নানারকম শিল্পীকে সামনে থেকে দেখলেন। হয়তো তাঁরা সকলেই ব্যাপক তারকা নন , কিন্তু তাঁদের শৈলীচর্চা দেখতে দেখতে শিশু চার্লি বুঝল , পদ্ধতিটাই সব। ফল-অফল কিছুই নিজের হাতে নেই। চর্চাটুকু আছে। লড়ে যাওয়া আছে।       ট্রু পে জারমো-কে কাছ থেকে দেখতে দেখতে চার্লি অভিভূত হল। জারমো প্রতিদিন মহলা শুরুর আগেই পৌঁছে যেতেন। থিয়েটারের দরজা খোলার সাথে সাথে অন্ধকার মঞ্চে তিনি জাগলিং অভ্যাস করতেন। বিশেষ একটা কৌশল রপ্ত করার পিছনে পড়ে ছিলেন দিনের পর দিন। মঞ্চে জায়গা না পেলে সাজঘরের নিরুপদ্রবেও চলত তাঁর অধ্যবসা। কেমন সে কৌশল? একটা বিলিয়ার্ড কিউ (বিলিয়ার্ড খেলার লাঠি) হাতে সোজা করে ধরে আরেক হাতে এক...