কথায় কথায় কাশ্মীর

প্রথম দর্শনে ডাল লেক




(১)

বিশ্বভ্রমণের আহ্লাদ জাগে মনে, 'আগন্তুক'-এর উৎপল দত্ত হতে অন্তর ওঠে চেয়ে, কখনও সখনও। বেড়াতে যাওয়া মানে শুধু মজার অতিবাহনে উল্লাসকর ক্ষণিকযাপন নয়। নিজেদের সীমিত পথটুকু পেরোলেই নতুন কিছুকে পাওয়া যায়; তা মন্দ অথবা ভালো, কৃতীময় অথবা দুষ্কৃতীময়, জঘন্য বা অমোঘ। আপন কূপের বাইরে মহাসাগরে ঝুপ করে গিয়ে পড়তে পারলে অনিশ্চয়তার ভ্রূকুটি যেমন থাকে, তেমনই অজানাকে সবিস্তারে জানার এক সম্ভাবনা তৈরি হয়। অনিশ্চয়তার ভীতির তুলনায় সম্ভাবনার রোমাঞ্চ অনেক বেশি আকর্ষণীয়। বিশেষ করে যারা অজানার হাতছানি শুনতে পেয়েও গৃহী পরিসরে বাঁধা পড়ে আছে। ভ্রমণের মধ্যে যে অনুচ্চারিত আলস্য আছে, আসলে তা সকলের জন্য সমান নয়। অনেকের জন্যই বেড়াতে যাওয়া মানে নিজেকে চেনা, হারানো আমি-কে হাতড়ানোর উপায়। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েও ধ্যানসর্বস্ব হওয়ার হদিশ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাস্তবায়িত কাশ্মীর ভ্রমণে শ্রীনগরের মাটি ছুঁয়ে দূর পাহাড় থেকে বয়ে আসা প্রথম বাতাসী ঝলক চোখে-মুখে প্রথম লাগল যখন, অনেকদিন বাদে প্রকৃতি-সমীপে মুক্তি পেয়েছি বলে মনে হল। আমি জানি, এই কাশ্মীর আসা একক মগ্নতায় সংসার-বিচ্ছিন্ন চেতনা নিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার নয়। বরং সংসারের কণ্ঠাশ্রিত হয়েও কামনা এই যে, আচমকা একেলা বোধের জাগরণ হলে যেন তার সাক্ষী থাকতে পারি, যেন সে যাপন স্বীকৃতি না পেয়ে পালিয়ে না যায়, পালিয়ে চিন বা পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মীরে না নতুন ঠিকানা নির্মাণ করে বসে।




    উপত্যকা কাশ্মীর ঐতিহাসিক চাঞ্চল্যকে ধারণ করে আছে। সে আপাতদৃষ্টিতে স্থৈর্য্য দেখাচ্ছে, তবে তা যেন ক্ষণস্থায়ী, যেন আবার ঝড় উঠতেই পারে, সাংঘাতিক রাত্রিরা ফিরে আসতেই পারে। এই ধীরতাই আসলে নতুন, আকস্মিক। এতে একীভূত হয়েছে উপরতলার রাজনৈতিক নির্দেশনা; সেই চিত্রনাট্য অনুযায়ী চলছে রূপনির্মাণ। শ্রীনগরের প্রথম হাওয়ার মধ্যে এত কথা বলা ছিল, নাকি এ আমারই পূর্ববাহিত বোঝা হতে নির্গত, তা আর আলাদা করতে পারিনি মোটে।



    বিমানবন্দর থেকে ক্রমশ বাইরের দিকে পা বাড়ানো হতে সশস্ত্র সিআরপিএফের দৃশ্যমানতা বাড়তে লাগল। তবে, গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রিপেইড ট্যাক্সি পাওয়া গেল অতি সহজে। উর্দির বুক চিরে ঈদের পরবের মাঝ দিয়েই আমাদের পৌঁছে দেওয়া হল ডাল লেকের ১৭ নং. ঘাটে। শ্রীনগরের মধ্যমণি ডাল লেক, সে যেন জীবিকার মেরুদণ্ড হয়ে সকলের বিনীত নমস্কার রোজ স্বীকার করছে। ডালগেট পেরিয়ে ১ নং থেকে ঘাটগুলি শুরু। প্রথমদিকের সমস্ত ঘাট ঘিঞ্জি, খানিক নোংরা তবু ঝিলমের জলের সিঞ্চনে ১ থেকে ১০-১১ নম্বর ঘাটেই যেন শ্রীনগরের প্রাণভোমরা। হাওয়ায় কাবাবের গন্ধ, চোখে স্পষ্ট হয় ডাল লেকের জলের ওপারে চিরজাগ্রত হিমালয়। এপ্রিল মাসে তার অঙ্গরাগ সবটাই শ্বেতশুভ্র নয়- চূড়া থেকে শ্বেত প্রস্রবণ খানিক গড়িয়ে পড়ে থমকে গিয়েছে। গোধূলির স্মিত হাসিতে সে পাহাড় জানান দিচ্ছে এই রূপটুকুতেই ফুরিয়ে যায়নি সে। আছে, আরও আছে। আরও দেখো আমায়, প্রতিবেলায়, মেঘে ঢাকায় অথবা ঝকঝকে চোখচশমায়।


    তীর ধরে ঘাটে ঘাটে শিকারা দাঁড়িয়ে। কিছু চলছে মাঝ ডালে। শিকারাগুলো জলের বড্ড কাছে, এই তার বিশেষত্ব। মানুষ ক্রমাগত আসছে, শিকারায় চড়ে পৌঁছে যাচ্ছে অপর পাড়ে। অন্য পাড়ে হাউজবোটের সারি। প্রথম ঘাটগুলোয় হাউজবোট একে অপরের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। দূরের ঘাটের দিকে ডাল লেক ক্রমশ চওড়া হয়েছে, সেখানে মানুষজন, শিকারা, হাউজবোট সবই সংখ্যায় কম। ইন্টারনেটের মোক্ষম যুগে বেড়ানোর জায়গার ভৌগোলিক অস্তিত্বকে আগে থেকে গলাধঃকরণ ঠিকমতো করা বেশ শৈলীর ব্যাপার। জীবনের শৈলীচর্চা ন্যূনতমতেও। সব শৈলীর এমনকি সামাজিক বৈধতাও নেই। তবু, এই যে মানুষ বন্দী হয়েও উন্মুক্ত থাকার চারুকলা শিখেছে, অথবা, মুক্তি পেয়েও স্বেচ্ছায় বন্দী হওয়ার শৈল্পিক মালা গেঁথেছে, তা অলক্ষ্যে থাকলেও অজ্ঞাত নয়।


    শিকারার বাহারি রং আর নীল জলের মায়ায় অভিভূত হতে পারার আগেই অন্ধকার নামল। সাড়ে সাতটার সময় চোখ সইল কাশ্মীরি আঁধারে আর তার ঠিক পরেই ঝোড়ো হাওয়া আর বরফকুচির মতো মিহি বৃষ্টি। ডালের জল টলমল করে উঠল, জলস্পর্শী শিকারা যেগুলো সদ্য ছেড়েছে তারা যেন এগোতে এগোতে দূর কালো পাহাড়ের কোলে গিয়ে জমা হচ্ছে, আর ফিরবে না বলে। শিকারায় আলো নেই, হৃদয়াকার দাঁড়গুলো মাঝিরা বাইছে প্রাণপণে। পাড়ের উত্তাল হাওয়ায় দাঁড়িয়ে ক্রমশ আমরা সম্বিৎ হারাচ্ছি, প্রথম সন্ধেতেই প্রাণতন্ত্রীতে বাজছে শীতল থেকে অতি শীতল সুর।


    জানা গেল, আপাতত পারাপার বন্ধ। জল শান্ত হলে দেখা যাবে। তারপর অপেক্ষার অশুভ সূচনা। গত কয়েক বছরে ব্যক্তিগতভাবে আমি নতুন জায়গায় পা দেওয়ার আগে অতি-গবেষণায় ছেদ টেনেছি। প্রথম দর্শনের মাদকতা, তার বিষণ্ণ বিস্ময়ের আভা অনেকটাই যেন আহত হয় পূর্বকৃত মাপামাপিতে। পাশের জন আজকাল সেসবের অনেকটাই সামলে নেয়; আমার তাই রক্ষে। তাই এই শীতল শিহরণে অন্ধকার পর্বত, উপত্যকা, সীমায়িত অথচ উত্তোলিত জলাধার সমস্তটাই যেন আমার কাছে নিমন্ত্রণপত্র হয়ে দাঁড়াল। আমি তাতে সাড়া দিতে থাকলাম। অপেক্ষার পীড়াকে মনোজগতে স্থান দিইনি বলেই বোধহয় শিকারা আবার ছাড়ার ডাক পেলে পর আলাদা করে তেমন আনন্দ হল না। গদিতে খানিক গা এলিয়ে দিলাম। ঝড়ের মূর্চ্ছনাকে সাথী করেই শিকারা তিরতির করে এগিয়ে-পিছিয়ে আমাদের নির্ধারিত হাউজবোটের পানে নিয়ে যেতে থাকল। আলো-আঁধারির বিহ্বল করা খেলা দিয়ে এই আমার কাশ্মীর যাপন শুরু।।


(ক্রমশ:)


ছবি: স্বহস্তে

Comments

Popular posts from this blog