লড়াই রাজা




চার্লি চ্যাপলিন ছোটবেলায় এক ট্রুপে মঞ্চানুষ্ঠান করতেন। অনেক ট্রুপেই করেছেন
তার মধ্যে একটিতে জারমো নামের একজন ছিলেন কৌতুকাভিনেতা তথা জাগলার। সেসময়ে ট্রুপে গীতিনাট্য, কৌতুক, মূকাভিনয়, সার্কাসে অংশীদার হয়ে সঙ সাজা- সবেরই পসরা সাজানো থাকত। মানুষের কখন কোনটা ভালো লেগে যায়, কখন কীসে সে বিনোদনরস পায়; তাই আয়োজন থাকত বিবিধ। যাতে প্রত্যেক দর্শক হাসিমুখে, ভরা মনে বাড়ি ফিরতে পারে। চ্যাপলিন তাই নানারকম শিল্পীকে সামনে থেকে দেখলেন। হয়তো তাঁরা সকলেই ব্যাপক তারকা নন, কিন্তু তাঁদের শৈলীচর্চা দেখতে দেখতে শিশু চার্লি বুঝল, পদ্ধতিটাই সব। ফল-অফল কিছুই নিজের হাতে নেই। চর্চাটুকু আছে। লড়ে যাওয়া আছে। 

    ট্রুপে জারমো-কে কাছ থেকে দেখতে দেখতে চার্লি অভিভূত হল। জারমো প্রতিদিন মহলা শুরুর আগেই পৌঁছে যেতেন। থিয়েটারের দরজা খোলার সাথে সাথে অন্ধকার মঞ্চে তিনি জাগলিং অভ্যাস করতেন। বিশেষ একটা কৌশল রপ্ত করার পিছনে পড়ে ছিলেন দিনের পর দিন। মঞ্চে জায়গা না পেলে সাজঘরের নিরুপদ্রবেও চলত তাঁর অধ্যবসা। কেমন সে কৌশল? একটা বিলিয়ার্ড কিউ (বিলিয়ার্ড খেলার লাঠি) হাতে সোজা করে ধরে আরেক হাতে একটা বিলিয়ার্ড বল উপরে ছুঁড়ে দিতেন। তারপর কিউয়ের মাথায় সেই বলটাকে ‘ক্যাচ’ ধরতেন। ধরে থাকতেন। এরপর আরেকটা বল ছুঁড়তেন। সেটা ধরতেন আগের বলটার মাথায়।

         এই দ্বিতীয় বলটা কিন্তু অনেক সময়ই পড়ে যেত। কিন্তু পড়ে গেলে, হাল ছাড়ার কোনও বিলাসিতা ছিল না। জারমো একটানা একমনে পাখির চোখ করেছিলেন এই বিশেষত্বকে। যেন তিনি এটুকুর জন্যই বেঁচে থাকতে পারেন। ট্রুপের ম্যানেজার মিঃ জ্যাকসনকে একদিন তিনি খুব অনুরোধ করলেন। বললেন, “আমি চার বছর ধরে এটা শিখেছি। দর্শকের সামনে একবার দেখাতে দিন না”। চ্যাপলিনের ভাষায়, মিঃ জ্যাকসন ছিলেন দক্ষ ও সহমর্মী ম্যানেজার। তিনি জারমোকে জায়গা দিলেন। বললেন, “বেশ, দেখাও দেখি সকলের সামনে”।

         মঞ্চের মধ্যমণি জারমো, চার্লি উংইসের ধারে। এতদিন আড়ালে, অন্ধকারে জ্বলা জারমোর বিলিয়ার্ড কিউয়ের কেরামতি আজ আলো পাচ্ছে। আর প্রথমদিনেই তিনি অব্যর্থ। দ্বিতীয় বলটা ঠায় প্রথম বলের উপর জায়গা করে নিল। কিন্তু, চার্লি দেখল, যে দুর্দান্ত, প্রায় অসম্ভব কাজটি জারমো অবলীলায় করে দিলেন, এতগুলো দিনের মগ্নতা সহায়ে, দর্শক কিন্তু তা দেখে আপ্লুত হয়ে পড়ল না। সামান্য কিছু হাততালি এদিক-ওদিক থেকে ছিটকে এল।

         সাফল্য-সার্থকতার গল্পগুলো সবসময় চরম উল্লাসকর হয় না। স্থির বিশ্বাসে তৈরি হয়ে জীবনমঞ্চে সবটা দেওয়ার পরেও হাততালির নিশ্চয়তা নেই। একথা কঠিন, তবু সত্য। তাই, পৃথিবীতে অর্থবিমুখ বা অর্থকেন্দ্রিক যত বীরগাথা আছে, সেখানে ফলাফলের থেকেও মহৎ হয়ে আছে তার পদ্ধতি। রোজকার লড়াইতে আরেকটা স্বেচ্ছা লড়াই বেছে নেওয়া। তাকে রোজ লালন করা। একদিন জল দিতে ভুলে গেলে পরেরদিন আরও বেশি যত্ন নেওয়া। আর যত্নের একাগ্রতা ঊর্ধ্বগামী হলে তবেই না ফলাফলের ‘লালসা’ থেকে নিজের দূরত্ব বাড়ানো যায়।

         প্রবল নিম্নচাপের রাতেও মানুষ এই বিশ্বাস নিয়ে শুতে যায় যে, কাল আর বৃষ্টি হবে না। অথচ সেবার শহরে দয়াহীন বৃষ্টি। তার মধ্যেও রাস্তা বেঁধে যেতে হলে, তাই হবে। ভেঙে গেলে আবার। প্রতিবার। ছোটবেলা থেকেই চ্যাপলিন শুনেছেন আশেপাশে কত বিরাট কৌতুকাভিনেতা অবসাদে আত্মহত্যা ছাড়া উপায় খুঁজে পাননি। গ্লাসগোতে অভিনয় করতে গিয়ে ইংল্যাণ্ডের তাবড় ও জনপ্রিয় কৌতুকশিল্পী মার্ক শেরিডান তেমন সাড়া পেলেন না। দর্শক যেন বুঝলই না তাঁকে। সেদিনই গ্লাসগোর এক সাধারণ পার্কে মার্ক নিজেকে গুলি করে শেষ করলেন।

         নিজেকে নিয়ে কারিগরিতে হাতুড়ির বাড়ি বারবার ভুল জায়গায় পড়তে পারে। হতে পারে, কৌশল রপ্তের দীর্ঘ পথে অনেকেই হাত ছেড়ে দিল। ছেড়ে দিল সবাই। তারপরেও মগ্ন অধ্যবসায়ের দিনান্তে যা পড়ে থাকে, তাকে সম্বল করেই বিলিয়ার্ড কিউয়ের মাথা থেকে বলদুটো পড়ে যায় না। এ বড় দহনের বিষয় যে, মানুষের জীবনের বেশীরভাগটাই কাটে আপন-পর সকলের কাছে নিজের যোগ্যতা ও মান্যতা প্রমাণ করতে। তারপর অনেকটা সময় চলে গেলে সে বোঝে, তাই তো, আমার ভিতরটুকুর টিকটিক কি শোনা হল কান পেতে? অথবা টিকটিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে জানা যায় শেষ হয়ে গেল, ফুরোল বেলা। এবার ছিটেফোঁটা পশলা হলেও হতে পারে কিন্তু হৃদয়ের সে ঝমঝম ধারা আর বইবে না।

         জারমো যখন হাততালি পেলেন না তেমন, মিঃ জ্যাকসন ডেকে বললেন, “তোমার খামতি কোথায় রয়ে গেল জানো? তুমি দর্শকের সামনে গোটা ব্যাপারটাকে জলবৎ করে দেখালে। তুমি তাদের বুঝতেই দিলে না, কত শ্রমের পর নিশ্ছিদ্র সাধনার পর এই কৌশল শিখতে পেরেছ। এ সবার দ্বারা হত না। তোমার শিল্পের দর তোমাকেই বোঝাতে হবে। তাই কয়েকবার মিস করতে হবে ইচ্ছে করে, ব্যর্থ হতে হবে। বলটা পড়ে যাবে এক-দুইবার। তারপর তুমি সফল হবে। তখন বাজবে হলভরা হাততালি।

         জারমো হেসে বললেন, “আমি তো সফল হওয়ার কৌশল শিখেছি চার বছর ধরে। ইচ্ছে করে মিস করতে যে অভ্যাস লাগে তা তো করিনি!”



তথ্যসূত্র: চার্লি চ্যাপলিন, মাই অটোবায়োগ্রাফি
ছবিসূত্র: লাইমলাইট (১৯৫২), চার্লি চ্যাপলিন, লিংকন ফিল্ম সেণ্টার

Comments

Popular posts from this blog