বিশেষ হয়ে রহ
যে সিনেমা, যে কাহিনী শান্ত করে, তার কাছাকাছি বসে বেশ উঠতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় থাকুক আর কিছুক্ষণ। বসি আরেকটু। খুব বিদ্বেষী, বিরাগী, অনুভববিহীনতার মধ্যে শিল্প যে সম্পর্কের অনন্ত দিককে আজও ছুঁতে চাইছে, আজও হৃদয়ের কথা বলা গল্পের প্রেরক ও গ্রাহক দুইই যে আছে, সেকথা আবার জেনে মনে হয় আবার বেঁচে উঠি। কোরিয়ান ছবি পাস্ট লাইভস (২০২৩) [পূর্ব জনম] সম্পর্কের অতি সামান্য এক গল্পকে বলার ঢঙের আত্মবিশ্বাসে উচ্চমার্গে নিয়ে চলে গেল। যেন ছবির সমস্ত কুশলী দেখিয়ে গেল পৃথিবীতে ধৈর্যের স্থান কতটা অটুট। এই ছবি বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার দ্বন্দ্ব নিয়ে মাথা ঘামায় না, দর্শককে চমকে দিতে চায় না, অবিশ্বাসীও করতে চায় না। শুধু চায় মগ্নতা, শুধু দাবি করে কাহিনীর বুননের মাঝেই নিজের মনের দিকে কয়েক পলক তাকানো হোক। মনে করায়, মানুষের একটা জীবন হল অসংখ্য অভাবনীয় স্তরের, প্রচুর জানালার, কী হতে পারত, কী হল না, কী থেকে কী হল-র চিত্রকল্প। তাই আপাতভাবে মানবজীবনকে মলিন, একঘেয়ে লাগলেও একটাই মানুষ অনেকগুলো গল্পের মুঠি ধরে থাকে। কোনওটাকে এতটাই চেপে ধরে থাকে যে সেটি জীবন জুড়ে ফুটতে পারে না, আবার কোনওটা মুঠো থেকে বেরিয়ে এসে গতিপথ বদলে দেয়। ঐতিহাসিকভাবে, ভৌগোলিকভাবে সমস্ত কিছুকে ওলট পালট করে দেয়।
ছবিতে দুটো স্কুলে-পড়া ছেলেমেয়ে খুব কাছের হয়ে থাকে, তারপর চিরাচরিত ছাড়াছাড়ি, বছর বারো পর পৃথিবীর দুই প্রান্তে বসে একে অপরকে অনেক হাতড়ে কয়েকদিনের ভিডিও চ্যাট। তারপর আবার বারো বছর পার। এবার আর যন্ত্রমাধ্যমে নয়, একটিবার চোখের দেখার সংযত রোখে ছেলেটির মেয়ের কাছে পাড়ি। ছেলে আর নেই সে, যৌবনের প্রান্তে পৌঁছেছে, কিন্তু তার মধ্যে চিরধার্য এক চাপা জীবন-বাসনা। আর মেয়েটি, যে ছোটবেলায় স্বদেশ ছেড়েছিল নোবেল জেতার স্বপ্ন দেখে, সে লেখিকা হয় বটে, কিন্তু ধ্যানী একাগ্রতা তার অস্ত্র নয়। সে নিছক সাধারণ, স্বপ্নপথে থেকেও নেই। দেখা হলে পর মেয়েটি আর ছেলেটি কথা হারিয়ে ফেলে। দিন তিনেকের দেখা, তার মধ্যে অপ্রাপ্তি মেটানোর উচ্চাশা নেই। দুজনেই জীবনকে গ্রাহ্য করেছে। দুজনেই জেনেছে, তাদের এই মিলনমন্দিরে বিরহের দেবীই আসীনা হয়ে আছেন। তাদের মিলন পরবর্তী বিরহকে আরও কাছে আনে, প্রতি বিরহ আবার কখনও দেখা হবে এই বিশ্বাস রেখে যায়।
সম্পর্কের কাব্যবিস্তারের ফাঁকে এ ছবি বলে দেশছাড়া হয়ে অস্তিত্ব হাতড়ানোর কথাও। বলে, মাতৃভাষাকে ছেড়ে বাঁচা যায় না বুঝি। প্রেমিক স্বামী আলিঙ্গনে টেনে তাই মেয়েটিকে জানায়, স্বপ্নে সে কোরিয়ানে বিড়বিড় করে। সারাদিন ইংরাজির মুখোশ পরে থেকে ঘুমের চেতনে আর ভণিতা করতে পারে না, তখন আপন ভাষাকেই আপন করে নেয়। মেয়েটি ইংরাজিতে বলে, সত্যি? আগে কখনও বলোনি তো!
ছোটবেলার সঙ্গীকে শেষবার (বা হয়তো নয়) উবেরে তুলে দিয়ে এসে মলিন কান্নায় স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে মেয়েটি ঘরে ফেরে। আর ভোরের আলোয় ব্রুকলিন ব্রিজ ধরে ছেলেটি চলে যায় এয়ারপোর্টের দিকে। দুজনেই টান চিরতরে মোছার অঙ্গীকার করে না, তবু দুজনেই ছেড়ে যায়। কাহিনী হয়তো চেনা, বা চেনার কাছাকাছি। কিন্তু এ ছবিকে আলাদা করে দেয় ওই অদ্ভুত স্তব্ধতা, মানুষের মনের না-মেলা জবাবের সঙ্গে চিত্রায়ণের মিশেল আর এক নিখাদ দৃঢ় শৈল্পিক সততা। আপন অনুভবকে সিনেমার ভাষায় সার্থক প্রকাশ।
পরিচালক সেলিন সং-এর প্রথম পরিচালনা এত বড় স্তরে। শুনেছি আদতে তিনি নাট্যকার। কী দাপুটে অভিষেক! জীবনকে মগ্ন হয়ে বাঁচার নমুনা। বিচ্ছেদে-বিরহেও সুন্দরের পূজারী হওয়ার সাধ। মানুষ চলে গেলে পড়ে থাকে কী? ঘৃণা থাকে কতদিন? মিলন ক্ষণিকের হলেও যাপন তার দীর্ঘায়ু হতে পারে, অনেক কালের। এ সমস্তটাই পাস্ট লাইভসের রসদ। শেষ দৃশ্যের ঠিক আগে, যখন বড়বেলায় একে অপরকে ছেড়ে চলে আসা হচ্ছে, আবার, তখন দুজনার এক ঝলক শৈশব ফিরে আসে। একইভাবে ওরা বিদায় বলতে না চাওয়া মুখে পরস্পরের দিকে চেয়ে ছিল কুড়ি বছর আগে। আজও নিষ্পাপেই তাকিয়ে থাকা।
ছবি বলে যায়, ফেলে আসা সবকিছু যেমন বিতৃষ্ণার নয়, তেমন আগামীর প্রার্থিত সবটাই তৃষ্ণা মেটাতে পারে না।
আর বলে, বিরহ ততটাই শৈল্পিক হতে পারে, যতটা হয় মিলন।।
ছবিসূত্র: পাস্ট লাইভসের মুহূর্ত থেকেই

Comments
Post a Comment