একটা একটা চিঠি
প্রিয় আক্ষেপ,
এখনও রোদ পড়ে আসেনি বটে। এখনও বুঝি খানিক জ্বলন, খানিক প্রার্থনা বাকি। মানুষের মুখে তোমার নাম দেখি সমস্ত প্রার্থনায়, বলে, জীবনে তখন মানুষের কাজ করার ছিল, করা হল না। আপন সংগ্রামে বুঁদ হয়ে থাকার ছিল, সেটিও হল না। হল কী? কেবল আত্মকে বিলিয়ে দিয়ে অন্বেষণের রাস্তা ভুলে যাওয়া। আর ভুলে যাওয়া পথে তোমাকে মনে করা, কেবল মনে করা সেই আগ্রহে যাতে সূর্যাস্তের সময়তেও আলোর মৃদুতার দিকে তাকিয়ে বলা যায়, করা হল না কিছুই। দেওয়া হল না মোটে।
মানুষের আবির্ভাব আকস্মিক। পরিশেষটির আভাস পেলেও দিনক্ষণ মূলগতভাবে আকস্মিক। দুইয়ের মাঝে পর্বটুকুতে শত ঝকমারি। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, পড়ে যাওয়া, অন্তর্বাসিনী প্রকল্পকে এড়িয়ে গিয়ে বহির্বাসিনীর তরে যৌবন-প্রৌঢ়ত্বের বিসর্জন। মাঝে মাঝে তোমাকে স্মরণ। একটি শিশু ফুলের মতোই জন্মাল। তারপর তাকে ঝড়ের ঘন কালো রাতে একা ছেড়ে দেওয়া হল। আশঙ্কা হল, রোমাঞ্চ হল, তাকে বড় হতে দেওয়া হল। কখনও এক মুহূর্তেই মানুষ হয়ে যায় অনেকটা বড়। আবার, অনেক বড় হয়েও সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, গুলিয়ে ফেলে। সে নতুন ফুটে ওঠা কুঁড়ির দিকে তাকিয়ে তাকে ইচ্ছেমতো বেড়ে ওঠার সাহস জোগাতেও পারে না- আকস্মিকতার করাল রূপটি চেনাতে পারে না। আকস্মিকতার ডামাডোলের মাঝেই ক্ষণেক নিশ্চিত না করা গেলে সেই আবার তুমি এসে পড়।
তোমাকে সব কথা বলে কী লাভ? তুমি তো একা করে দিয়ে যাও। যতটা আসলে একা, তার চেয়ে বেশি। তুমি জানতে দাও না তিলে তিলে বৃদ্ধিলাভ; তুমি বুঝতে দাও না তলে তলে ক্ষয়ে যাওয়া। যদি তোমাকেই বলা যেত, বোঝানো যেত উল্টে, যে আসলে কিছুরই তেমন মানে নেই। গভীরতা নেই, সহন নেই, কাব্যময়তা নেই। নয়তো বা খুব বেশি করে আছে। এতটাই বেশি যে আমরা ধর্তব্যে আনতে পারি না। আমাদের সামান্য জীবনের সংকীর্ণ ক্ষেত্রে তাকে ধরা কঠিন। মুঠোর মধ্যে আকাশ কেমনে ধরা যায়? অন্তর্লোকের ব্যাপ্তি মানবের আয়ত্তের বাইরে থাকে, তাকে পাওয়া আর অধরা রয়ে যাওয়ার মাঝে তোমার অবস্থান। তোমার হাত ধরে অনেক অনুজ্ঞা, অকারণ দোষারোপের পাপ বয়ে নিয়ে যেতে হয়। তুমি ডেকে বলো, এই যে আমি। এটাই। তোমার জন্য আমার বাস্তব সহজ হয় না। তোমাকে অতীতে পাই, বর্তমানেও পাই। ভবিষ্যতে আর না দেখা করার প্রতিজ্ঞা করি। সেই ভবিষ্যৎ যখন আবার অতীত হয়ে যায়, তখন দেখি আবার তুমি। তুমি কেমন করে আছ? তোমার আগমনের খবরে কাউকে সুখী না করেও তুমি যে সদা জেগে আছ, এই কি তুমি চেয়েছিলে?
আক্ষেপ, তুমি বাঁধা পড়েছ। তোমার স্বাধীন সত্তায় তুমি নিজেই দিয়েছ আঁচড়ে। তোমার সঙ্গে আমি আর কথা বলব না। তবু জানি, তুমি ফিরে ফিরে আসবেই অভুক্তের মতো।
আমি চাই, তোমার অন্তহীন খিদেই আমার জীবন থেকে তোমাকে চিরতরে মুছে দিক।
Comments
Post a Comment