মোরে আর দিও না প্রাণ




ঘন অন্ধকার সে রাতে বাচ্চাটা স্বপ্ন দেখেছিল সাধারণের ভিড়ে দাঁড়াবে না কখনও। জীবনাবর্তের প্রকার নিয়ে জীবনকথকরা অনেকবার বলেছেন, এ ভাবগতিক বড় ভ্রমাত্মক, এভাবে মাপজোক করে চলতে চলতে একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে সব, নেওয়া বা রাখা- হবে না কোনওটাই। তেমন অবান্তর আলেখ্য জেনে ও ভুলে গিয়ে মানুষ প্রজনন ঘটায়, নিজের অপারগতা ঢাকতে নতুন প্রাণ এনে তাকেও অপারগ করে তোলার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। স্বপ্ন দেখা বাচ্চাটা তাই শেষ অবধি লাইনে এসেই দাঁড়াল। এমন দাঁড়িয়ে পড়ায় মানুষ জেতে, মানবতা নয়।


    ধরাতে বাচ্চাদের ধরা পড়ার দায়টা কোথায়? তারা আসবে কি আসবে না, এ নির্বাচন তাদের হাতে নেই। হ্যাঁ, মানবজীবনের মেঠো রসে সিক্ত হওয়া এক সৌভাগ্যের ব্যাপার বটে। কিন্তু ক'জনের হয় সে সৌভাগ্য? সৌভাগ্য আর বিলাসিতার মাঝে সমান সমান চিহ্ন বসানো মানুষ তার সন্তানকে বোঝাতে পেরেছে যে, কুক্ষিগত চিত্তে আপনমগ্ন হয়ে থাকাকেই সার্থক মানবজীবন বলে। এই বহমান প্রকল্পকে সঙ্গী করেই আমরা একের পর এক প্রজন্মকে অপরিবর্তিত ধারাবিবরণী শুনিয়ে গেছি। তারপর পিলপিল করে বাচ্চারা যুদ্ধে মরে গেছে। অথবা না খেতে পেয়ে। জন্মদাত্রী-দাতাদের রোগ বয়ে। টিকিট না কেটেই নিজের সন্তানদের খুঁটে খাওয়ার ঠাসা বাসটায় তুলে দেওয়া হয়েছে। হয়তো ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে বাসের ভিতরেই দম বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো কেন, হবেই।

    প্রতিটি শিশু সম্ভাবনার একটা ডালি নিয়ে আসে ঠিক। কিন্তু মূল্য না চুকিয়ে সম্ভাবনার রূপায়ণ হয় না। মূল্য চোকানোর শিক্ষা না দিলে শিশুটিও জেনে রাখে তাকে বাদ দিয়ে আর পৃথিবী নেই। কারণ সে যে চোখের সামনে দেখে, তার চলচ্চিত্রের নায়িকা-নায়করাও স্ব-নির্মিত বেড়াবন্দী। বীভৎস বৈষম্যের সাক্ষ্য বয়ে চলে বাচ্চারা, আজন্ম। কেউ জীবনে একটা স্কুল ড্রেস পায় না, আবার কেউ জানেই না শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও ক্লাসঘর হয়! আমাদের দিনগত পাপক্ষয়ের চেনা বুলিতে সন্তান স্রেফ গা ভাসিয়ে দেবে- সৎ লড়াইয়ের সাহস সঞ্চয় করতে পারবে না, ভিড়ের মধ্যে গাদাগাদি করবে কেবল, করতে করতে নিঃশেষিত হয়ে যাবে- স্বপ্নসূচকে ধাক্কা খেয়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না বারবার। কারণ, তার সূচককে মাথার উপরে রাখার বদলে কোমরে নামিয়ে আনা হয়েছে। তার মাথা আনত, সে বুক চিতিয়ে মাথা তুলে জীবনসংগ্রামের সামনে দাঁড়াতে পারেনি।


    প্রাপ্তবয়স্কদের মেকি যুদ্ধে আবারও ঠিকমতো নাক মুছতে না পারা বাচ্চাটা ঘুমের মধ্যেই মারা গেল। অনেকগুলো লাশ পুঁটলি বেঁধে জড়ো করে এক জায়গায় করা হল। সারা বিশ্ব তবু ঠিক করে উঠতে পারল না একে অনাচার বলব কি না। যারা মৃত্যুমুহূর্ত অবধি জানেনি এ লড়াই কী নিয়ে, কীসের দাবিতে, কাদের ভালো থাকার সংশয় কাটাতে, তারা মরল বটে, কিন্তু শহীদসম্মান পেল না। পেটের বা মস্তিষ্কপুষ্টির চাহিদা না ফোটা বাচ্চাটা মরে যেতে যেতে বলে যেতে পারল না তার জীবনটা কেমন হবে বলে সে ভেবেছিল।

    অষ্টম বসু ভীষ্ম পূর্বজন্মের পাপ থেকে মুক্তি পেতে মর্ত্যে জন্মালেন, মা গঙ্গা তাঁকে ভাসালেন না। ভীষ্মের মানবজীবন অভিশাপের ছিল, আশীর্বাদের নয়। সেই সজাগ কষ্টসাধনের ফলজ্ঞাপন করেই বুঝি ভীষ্ম নিজে আর প্রজনন করলেন না। বিধ্বস্ত পৃথিবীকে আরেকটু ভালো না করে সন্তানধারণ এক অলিখিত পাপ বটে। 

    তারপরেও যে সন্তান বিভেদ করে না, অহং নেই যাদের, হিংসার বদলে হিংসা ফিরিয়ে দেওয়ার বিশ্বাস নেই- কষ্ট বুঝি তাদেরই বেশী। কাল বরাবর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চাইবে তাদের- এমনকি তার আপন সৃষ্টিদাতা-দাত্রীর কাছে সে চড় খাবে, লড়াইয়ের চেনা টেস্ট পেপার আত্মস্থ করেনি বলে। 


    এমন এক প্রেক্ষিতে সন্তানোৎপাদন জীবলোকের স্রেফ আদিম রসমগ্নতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। তাই ছেলে চেয়ে অথবা মেয়ে চেয়ে, কালোর বদলে ফর্সা চেয়ে, বেঁটে না হোক লম্বা চেয়ে, নাদুস-নুদুস থেকে রোগা-য় প্রতিবর্তন চেয়ে, আমরা সন্তান চাওয়াকেও রেশন চাওয়ার স্তরে নামিয়ে আনি। তারপর যা হওয়ার তাই হয়। হিসেব মেলে না। ঘন কালো অন্ধকার রাস্তায় বাচ্চাটা হাতড়ে বেড়ায় তার বেঁচে থাকার কারণ।


যদি ততক্ষণ অবধি বেঁচে থাকে, তবেই।।



ছবিসূত্র: গেটি ইমেজেস

Comments

Popular posts from this blog