অবিশ্বাসী বিপ্লবের অচেনা পথ







শেষবার পথ হেঁটে এসে শুরুটা আবার দেখতে চাই। কান্নার দমক ফুরোলে পর হাসিবিশ্বে বিলীন হতে চাই। মানুষকে যত দেখি তত অবাক হই। মলিন মুখে কষ্টের মুহূর্তদের একজায়গায় করে কত মানুষই না বেঁচে আছে। বাহাত্তর বছর পর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কেউ যদি বলতে পারে, আমি ওপারে পৌঁছে অপার হতে চেয়েছিলাম- তখন সে জানবে এবার ফুরিয়েছে বেলা। এবার আর খুশি করার দায় নেই, সুখী বানাবার বাধ্যতা নেই। এবার আর কিছুই নেই যেন- মহাশূন্য, মহানির্বাণ। 

এবার পৃথিবীর চাই একটা আন্দোলন, সমস্ত ভাঙা ভাঙা আন্দোলন জুড়ে নিয়ে একটাই আন্দোলন ঐক্যের একটিমাত্র বাণী- সে আন্দোলন সত্যের।


সত্যাগ্রহ থেকেও কেবল সত্যটুকু ছেঁকে নিতে ইচ্ছে করে। সত্যের মহান্দোলনে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সত্যি কথা বলবে, সত্যকে খুঁজবে। প্রাপ্তবয়স্ক অপ্রাপ্তকে বোঝাবে তার গন্তব্যে আপন সত্যাবিষ্কার হল সর্বাগ্রে; তার জন্য সে আপনতরকেও ছেড়ে যেতে পারে, গেলে তাকে কেউ দাগিয়ে দেবে না। তোমার সত্যের সঙ্গে আমার সত্য মিলে যাবেই বলে ধরে নেবে না। বরং না মিললেই জানা যাবে সত্যপূজার মর্মার্থ। বীজমন্ত্র 'সত্য'- সুন্দর হোক অথবা অসুন্দর। রোজই কত মিথ্যে জিতে যায়। আধ আনা মিথ্যে ঢাকতে ষোল আনার আশ্রয় নিই। সত্য আর মিথ্যাকে প্রয়োজনীয় আর অপ্রয়োজনীয়ের নিরিখমণ্ডিত না করে রেখে অকৃত্রিমভাবে পাওয়া গেলে পৃথিবী কি আরেকটু স্বচ্ছ হবে? যে সত্য বিরাজমান আছে, তাকে আর রাংতায় মোড়ানোর দরকার নেই তো, মোড়ালেও রাংতা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসুক যা আছে, তা। 


সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি জীবলোক একদিন শুধু সত্য বলল, সত্য শুনল, যা সত্যের অনুকূলে- ঠিক তাই তাই করল- এই হোক আন্দোলনের পথ। দিনের শেষে ঠিক করুক পরেরদিন এক বিপ্লবের বিপ্লবী থাকা সম্ভব কিনা। যা পরিপন্থী, তার দিকে, তাদের দিকে তাকালো না। তাতে কী হল? অনেক মানুষ রাতারাতি একা হয়ে গেল। মিথ্যাসঙ্গী হওয়ার ভয়ের থেকে একা হওয়ার ভয় বড়। সেকারণেই ঠিকটা হচ্ছে না, সত্য ক্রমশ দূরবর্তী হচ্ছে জেনেও সবকিছু ছেড়েছুড়ে চিদানন্দের উপায় নেই। উপায় হবে সত্য যখন হবে বিপ্লব, যখন স্বার্থ খোঁজার পালায় রইবে শনাক্ত ঐক্য, যে আমি সত্যটুকুই জানব, বাকি সবকিছুকে আমি অবজ্ঞা করতে পারি। কঠিন শোনায়। বেঁচে থাকার চেয়ে কঠিন নয়, বরং বেঁচে থাকাকে সহজ কাঠামো দিতেই সর্বময় সত্যকে আঁকড়ে ধরার দরকার ছিল। কিন্তু, চারপাশটায় মিথ্যা জিতে গেল, আর মিথ্যার খেলায় সত্য দর্শক হয় না, সে খেলা যদি আমি সমর্থক হয়ে দেখি, বা শুধুই দেখি, তবুও আমি সমাজমিথ্যার জালে জড়িয়ে গেছি।


সত্যের সাথে দোষের বেশ স্পর্শকাতর একটা সম্বন্ধ আছে। দোষারোপের পদ্ধতি এমনটাই, অপরকে তুলে ধরতে গেলে আপন সত্যের থেকে নজর ফেরাতে হয়। প্রাথমিকতাকে স্বীকৃতি দিতে গেলেও অনেকটা তাই,যা এই মুহূর্তে মনে হল তা-ই শুধু সত্য নয়, এই মনে হওয়া বদলাবে, প্রাচীন মিথ্যাসার থেকে সত্যের পাপড়ির উদয় হবে- আমার চেতনার সঙ্গে সেই পাপড়ির উন্মীলন যাবে একাকার হয়ে। এতটা জায়গা মানবমনে আছে? আছে, থাকতেই হবে, মানুষ ছাড়া আর কারোর নেই। 



এ অকূল নদীতীরে আমার একাকিত্ব আর আমার সত্যের মাঝে সংঘাত না থাকে যেন। সরলপথে সে প্রার্থনা হয় না মোটে।



একটি ছেলে বাড়িতে মিথ্যা বলে তার স্বপ্নের সন্ধানে পাড়ি দিল। পাড়ি দিয়ে দেখল, যে স্বপ্ন ছিল আপ্রাণ, সেটার সারবত্তা আর খুঁজে না পাওয়া যেতে পারে। নিজের সঙ্গে মিথ্যে স্বপ্নের মিথ্যাচার করার আগে সে জানত না ঠকে যাবে নিজের কাছে। এখন সে কোন সত্যের কথা বলবে? কাকে বলবে?


বিপ্লবী সত্যের যাবতীয় প্রকল্প নিজের কাছেই। আমাকে জানতে হবে আমাকে ঘিরে থাকা গভীরতর সত্যনির্মাণের পথ। তোমার আমার জানা থাকায় আপোস হলেই একপাক্ষিক সত্যের লঘুতা দেখা যায়। তখন অভিনয়।



সত্যবিপ্লব আগে জীবনের আঁচ পাক, আলোকপ্রাপ্তি ঘটুক। তারপর তাকে দীর্ঘজীবী বানানো যাবে।। 





ছবিসূত্র: মাক্সিম ক্রাফ্তের আঁকা তৈলচিত্র থেকে [https://www.artmajeur.com/]






Comments

Popular posts from this blog