নব অথবা পুনর্জাগরণ
শৌণক দত্ত
দেশ আমাদের বীরভোগ্যা সেকথা আমরা সকলেই জানি এবং মানি। সমাজের
সমস্ত স্তরে বীরের খোঁজ করতে গিয়ে খানিকটা ব্রেশটীয় করুণাও আমাদের প্রাপ্য। প্রণম্যদের
প্রণাম করতে করতে আদতে আত্ম-উত্তরণের পথে দিগভ্রান্ত হয়েছি আমরা। তবু, কয়েকজন মানুষ
আছেন যাঁদের জীবনভোর সাষ্টাঙ্গ প্রণাম আর স্তুতিতে ভরিয়ে দিয়েও মনে হয় উপচারে কোথাও
বুঝি ত্রুটি রয়ে গেল। সত্যজিৎ রায় তেমন একজন মানুষ।
বৈদগ্ধ্যের বৃত্তে অনেকেই তাঁকে ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’-র শেষ ব্যাটনধারী
বলেছেন, নানারকম বিশেষণে অভিহিত করেছেন। তাঁর শিল্পকে প্রতি ছত্রে ছত্রে আবিষ্কার ও
পুনরাবিষ্কারের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। তাই, সত্যজিত-এ অঞ্জলি অর্পণের অযোগ্যতার
কথা পুরোপুরি স্মরণে রেখে এবং বাঙালি চেতনার পঞ্জীকে বিনীতভাবে স্বীকার করেও আজ নতুন
করে বলার সময় এসেছে যে, সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতাকে যদি মাপকাঠি ধরা হয়, তবে দুজন মানুষ
আমাদের বৃ্ত্তে সমভাবে অপরিহার্য। কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কারণে নয়। নিজেদের
শিল্পকীর্তির প্রতি আত্মবিশ্বাস ও সততার জন্যে।
একজনের রচনাবলীর সবটা ঘরে রাখা আজও অনেকের স্বপ্ন, আর অন্যজনের
প্রতিটা সৃষ্টিকে আমরা পরিবারেরই একজন বলে মনে করি। দোসরা মে পশ্চিমবঙ্গ হয়তো তার আসন্ন
ভবিষ্যৎ আর সাম্প্রতিকের ঔদ্ধত্যে মগ্ন থাকতে গিয়ে সত্যজিত রায়ের জন্মশতবার্ষিকীকে
অবজ্ঞা করে যেতে পারে। কিন্তু, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত আবার আমাদের হাতেই ঘটবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা ভাষার প্রতিনিধি হয়ে আসার আগে
থেকেই মনে মনে যে পাঠক্রম তৈরী করছিলাম, অবধারিতভাবে সত্যজিৎ সেখানে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
ওজনদার বিশেষণে ভরিয়ে দেওয়ার আগে তাই প্রথম সেমেস্টারে অপরাজিত-র সেই পাঠশালার
দৃশ্য দেখানো হল। দেখিয়ে বলা হল, ঠিক-ভুলের চিন্তা না করে যেমনটা উপলব্ধি হল তেমনটাই
লিখতে, অথবা বলতে। আর রঙিন ছবির অত্যাধুনিক দুনিয়ায় চির অভ্যস্ত একটা প্রজন্ম সাগ্রহে
জানাল তাদের উপলব্ধির কথা। সত্যজিত ঐ একটিমাত্র দৃশ্যতেই সংযোগ তৈরী করে নিলেন। সাংস্কৃতিক
অনুজ্ঞা আর ভারতীয় সিনেমাশিল্পের দ্বিবিধ দায়িত্ব সাবলীলভাবে কাঁধে নিয়ে এরপর থেকে
সত্যজিৎ ক্লাসের একজন হয়েই রইলেন।
অতঃপর গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, সোনার কেল্লা
তাদের নিজস্ব অধিকারবলেই একে একে জায়গা করে
নিতে থাকল। সবরকম শৈল্পিক বিশেষত্বের সাথে এমনকি বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও ব্যবহারিক সত্তাকে
সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলার জন্য সেই সত্যজিৎ রায়েরই প্রয়োজন পড়ল।
সত্যজিতের রেনেসাঁধর্মিতার
অবশ্য উল্লেখ্য একটি দিক হল যে তিনি নিজের কাজকে যাবতীয় সময়ানুবর্তী সংস্কারের ঊর্ধ্বে
নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি, সেসব তাঁর ছবিতে উঠেও আসে ঠিক।
কিন্তু প্রত্যেকটি ঘটনা সেই তাৎক্ষণিক সময়ে আটকে না থেকে চিরকালীনের বার্তা নিয়ে আমাদের
সামনে হাজির হয়।
অপরাজিত ছবিতে বৃহত্তর বিশ্বের সাথে অপূর্বের আলাপ হচ্ছে প্রথমবার,
হেডমাস্টারের দেওয়া বিদেশী বইয়ের হাত ধরে- আর পরিচালক কী করছেন? তিনি দেখাচ্ছেন জীর্ণ
আলমারি, কুণ্ঠিত কিশোরের সারল্যে ভরা মুখ আর কিছু সময় পরেই তার সামনে যে নতুন একটি
দুনিয়া উন্মোচিত হবে, সেই সম্ভাবনার চাপা উচ্ছ্বাস। তারপর হেডমাস্টারমশাই নির্বাক অপুকে
বলে দিলেন, “এসব বই না পড়লে মনের প্রসার বাড়ে না। আমরা বাংলাদেশের একটা রিমোট কর্ণারে
পড়ে আছি বলে আমাদের যে মনটাকে ঐ কোণঠাসা করে রেখে দিতে হবে, এমন তো কোনও কথা নেই”।
নিজের অভিব্যক্তির প্রতি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী না হলে এমন বয়ান তৈরী করা যায় না। কেবলমাত্র
চিত্রপরিচালক নন। শিল্পীমাত্রেই একথা মানবেন।
ব্যক্তি সত্যজিতের অনুভূতিপ্রবণতার জন্যই হয়তো তাঁর ছবির
শিশুশিল্পীরা প্রত্যেকে দাপুটে অভিনয় করে গেছে। সোনার কেল্লা-র দ্বিতীয় মুকুল;
কী অদ্ভুত সাবলীল। ছবির খলনায়কদের কার্যকলাপের সাথে তখনও দর্শকের চাক্ষুষ পরিচয় ঘটেনি।
তাদের নৃশংসতা বর্ণনার ভার কাহিনীকার তুলে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় মুকুলের কাঁধে। এ যেন
কারিগর আর তাঁর প্রতিমার অবিচ্ছেদ্য বাঁধনের সার্থক উদযাপন। বয়সের ভেদ ভুলে পারস্পরিক
সম্ভ্রমের দেওয়া-নেওয়া।
ক্লাসের আলোচনা থেকেই উঠে আসে সত্যজিৎ রায়ের আরেকটি দৃষ্টান্তমূলক
ক্ষমতার কথা। প্রকাণ্ড থেকে অতিক্ষুদ্রে, ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি, মাঝারি থেকে আবার বৃহৎ
বিন্যাসে তাঁর অনায়াস যাতায়াতের বিষয়টি। কখনও আগন্তুক-এ একক মানুষ তাঁর পৃথিবীব্যাপী
অভিজ্ঞতার একমাত্র ধারক হয়ে উঠছেন, আবার কখনও যুদ্ধের নৃশংসতাকে অস্বীকার করার জন্য
একই পরিচালক সিনেম্যাটিক সক্ষমতার সবটা উজাড় করে দিয়ে যুদ্ধের আবহকেই পর্দায় দেখাচ্ছেন।
ছবি তৈরীর যান্ত্রিক আঙ্গিকে আজ আমূল উন্নতি ঘটে যাওয়ার পরেও
দেশবিদেশের পরিচালকরা সত্যজিতে পোঁছে রোজ রোজ মুগ্ধ হচ্ছেন। কারোর স্বার্থবহ আনুকূল্যে
নয়, তিনি হৃদয় জয় করে চলেছেন একেবারেই স্বোপার্জিত যোগ্যতায়। কারণ, ছবি তৈরীর সময়ে
নিজের ভৌগোলিক অবস্থানের সাথে কোনওরকম ভণিতা তিনি করেননি। দর্শকের কাছে আরোপিত জীবনবোধের
বোঝা নিয়ে উপস্থিত হননি। যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কাছে অনুভবের আত্মসমর্পণ ঘটতে দেননি।
সত্যজিৎ রায় আজ আর আমাদের মধ্যে নেই বলে ব্যক্তিগতভাবে শোকের
উপলব্ধি কখনই হয়নি। তিনি আছেন তো। অতীতকে ছাপিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টার পরে আজ
অতলান্তিক পেরিয়ে বাংলার সংস্কৃতির সাথে সদ্য পরিচিতদের সামনে নয়তো তাঁকে এত প্রাসঙ্গিক
মনে হয় কেন? তাঁকে জোর করে বাদ দিয়ে পাঠক্রম তৈরী করতে গেলে কেন বারবার হৃদয়বৃত্তে
খোঁচা লাগে? কেন মনে হয় কী যেন বাদ পড়ে গেল? কার যেন এখানে অবশ্যই থাকা দরকার? একজন
শিল্পী মহাকালের কাছের এর চেয়ে বেশী আর কী চাইতে পারেন।
বাংলার নগরায়ণ আর সাংস্কৃতিক অভ্যাসে অনেক নতুন আঁচ এসেছে।
সত্যজিৎ রায়ের কাজ থেমে যাওয়ার পর থেকে অসংখ্য বাংলা ছবি নির্মিত হয়েছে। তারপরেও ২০২১-এ
দাঁড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ফিল্ম আর্কাইভে ‘বেঙ্গলি
ফিল্মস’ বলে সন্ধান করলে দুটিমাত্র ছবির নাম জ্বলজ্বল করে ওঠে। ছবিদুটি যথাক্রমে পথের
পাঁচালী ও জলসাঘর। খুব তাড়াতাড়ি অপরাজিত-র তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা।
ছবিসূত্র: দ্য ডেইলি ক্যালিফোর্ণিয়ান

Comments
Post a Comment