কিছু পেয়েছির দেশ


শৌণক দত্ত






রবীন্দ্রনাথ আমেরিকা থেকে ফিরে ‘শিশু ভোলানাথ’ লিখতে বসেছিলেন। কারণ আমেরিকার রসাস্বাদনের পর তাঁর কাছে ‘বিষ’ ঝাড়ার বিশেষ প্রয়োজন হয়েছিল। কেমন দেশ আমেরিকা? কেমন তার চলন? কেমন করে সে মুক্ত বিশ্বের চরম মুক্তিকামী মানুষের কাছে চির আগ্রহের হয়ে উঠেছে? এ দেশের গোড়ায় গ্রথিত আছে মানুষ কেনাবেচার কাহিনী। মানুষকে একদা পণ্য বানানো দেশ এখন খাতায়-কলমে বিশ্বকে শেখাচ্ছে পণ্যমোচনের প্রভাব-প্রতিভা-পরাশ্রয়তা।

প্রাকৃতিক নিসর্গের অনুরণনকে রাখা যাক একদিকে, মার্কিন বাতাসের আরেক দিক জুড়ে আছে নারী-পুরুষসহ সমস্ত লিঙ্গের মানুষকে নিয়ে অভূতপূর্ব অংশগ্রহণের সমাজ- যেখানে প্রায় প্রত্যেক জীব আপন পরিচয় নিয়ে সচেতন। অন্যের পরিচিতি বহন করে সে জীবন অতিবাহনের স্বপ্ন অন্তত দেখে না- সকলের চোখে আপন আপন স্বপ্ন। পাশের মানুষ, সঙ্গে থাকা মানুষ সেই স্বপ্নের সহচর হতে পারে, বাধাপ্রদানকারী কখনই নয়। বাধা দিলে পাশের মানুষ আর রইলে না তুমি। আমার ভালো আর চাইলে না তুমি। তাই তোমার ভালোতেও আমার আর অংশগ্রহণ রইল না। একা থাকার চেনা ব্যাকরণ বিফলে গেলে অবলম্বন নতুন করে ব্যাখ্যাত হবে- তোমার ক্ষতি না চেয়ে আমি ক্রমশ সরে যাব দূরে। একটু দূরে কাজ না হলে অনেকটা দূরে।

কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অদ্ভুত মিলেমিশে অংশগ্রহণ আমার চেনা পুরুষ-প্রাধান্যের চোখে কেমন অবিশ্বাস্য মনে হয়। মনে হয়, আমি কোনও স্বপ্নরাজ্যে নেই তো? হয়তো সেখানেও লিঙ্গচৈতন্য কভু তীব্র ব্যতিক্রমী কার্যকারিতায় এই ছবিকে ভস্ম করে দেয়। তবু, আমেরিকা আজ যা, তার পিছনে অর্থনৈতিক কাঠামো যা-ই থাক; নারী, ভিন্ন লিঙ্গকামী মানুষ, পুরুষ সকলে যে সমাজে নিজের অবস্থান নিয়ে এতটা সচেতন এবং গরিষ্ঠ সংখ্যক প্রতিষ্ঠান যে এই সচেতনতাকে মান্যতা দিয়ে চলেছে, অন্যথা হলে প্রতিবাদ করছে, সোচ্চার হচ্ছে প্রতিনিয়ত- দেরী হলেও প্রায়শ্চিত্ত করছে- এ যেন দেশের রন্ধ্রে এখন গ্রথিত।

অপরাধ রয়েছে। ধনতান্ত্রিক দেশে অপরাধের ভয়াবহতাও আগ্রাসী। সমাজবিরোধীর আতঙ্কে ঘরে আটকে থাকা নেই। আমেরিকা চলছে, চলছে তো চলছেই। মধ্যরাতে এক বাড়ি থেকে পুরুষ কোনও প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে বেরোচ্ছে, নারীও বেরোচ্ছে- একা কিংবা সখীসনে। একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে না। মেয়েটিকে প্রত্যেক পদক্ষেপে সাহসিকতার বর্ম উঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে না। খানিক এগিয়ে যদি একে অপরের হাতে হাত রাখে, বা চুমুও খায়- বাকিরা কাছের হলে সেই মিলন উদযাপন করবে, দূরের হলে তাকাবে না- তাকালেও বুঝতে দেবে না। অপ্রস্তুতিতে ফেলবে না।

আমেরিকায় এসে প্রথমবার দেখলাম “লোকে দেখে কী বলবে”-সূচক প্রশ্নটি সমাজজুড়েই না থাকলে জীবনযাত্রা কেমন হয়। যে পোশাকে মানুষ নিজে স্বচ্ছন্দ সেই পোশাকেই সে বাজারে যেতে পারে, গাড়ি চালাতে পারে, প্রিয়জনের সাথে দেখা করতে পারে, ঝগড়া করতে পারে। কারোর কাছেই সুযোগ্য বিশ্লেষণ করতে বসা নেই, কেন এমন পোশাক পরেছিলাম অথবা চেহারায় বদল এল কী করে? বিপ্রতীপে রয়েছে সেই একায়িত মনন- ঝড়-ঝঞ্ঝা-বিপদে সাহায্যের প্রয়োজন না জানানো অবধি অপরের হস্তক্ষেপ রইবে না। তাই মানুষ বার বার সাধবেও না। তার কারণ এটা নয় যে একবার মাত্র সেধেই সে কর্তব্যের দায় ঝেড়ে ফেলছে; আরেকবার বললে পাছে সে রাজি হয়ে যায় আর ঝক্কি পোহাতে হয়। সাধা নেই ঐ আত্মিক মগ্নতাকে জায়গা দেওয়ার জন্য। সকলের ইচ্ছার গুরুত্ব আছে সেটি বোঝানোর জন্য। না মানে না-এর মর্ম উপলব্ধির জন্য।

বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন ইতিহাস বয়েই আনুক না কেন- লিঙ্গচেতনার এহেন অসামান্যতার সাথে সচরাচর অভ্যস্ত হয়ে যায় অল্পদিনে। যে মানুষ স্বদেশে অন্যের পোশাক নিয়ে অসংলগ্ন মন্তব্য করত সেই মানুষই ফাইভ-জির মোহে আবর্তিত হতে হতে সাম্যের ভঙ্গি রপ্ত করে নেয়। সকলে মন থেকে বিশ্বাস করতে পারে কিনা জানি না, তবে মুক্ত সমাজে নিজের সংস্কারগত ব্যভিচারকে যে স্তিমিত রাখতে হবে সেকথা কানে কানে কেউ না বলে গেলেও সকলে বুঝে নিতে পারে।

লিঙ্গসাম্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পসরা আগে থেকে সাজিয়ে আমেরিকাকে দেওয়া হয়েছে এমনটা নয়। মানুষই তার মতো করে অভ্যাসে অভ্যাসে আমরাও পারি বলে ভরসা জুগিয়েছে রাষ্ট্রকে। পাশবিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে তাই এমন রীতি বৃহত্তর পরিবেশনের অঙ্গ হতে পেরেছে। যদি ভাবি, এমনটা স্বপ্নসম, পৃথিবীব্যাপী বাস্তবগামী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই- তা হবে আমাদেরই আর্শ প্রয়োগ। আদতে মানুষের মধ্যেই সমস্ত অনন্ত অসম্ভাব্যকে সম্ভব করার চির সাধনা। আমেরিকা ধনপূজারী বটে- তবে দৃষ্টান্তমূলক কিছু বৈশিষ্ট্যকে সে নিজের চরিত্রের সাথে মিলিয়ে নিয়েছে- যার রূপায়ণের জন্য প্রত্যক্ষভাবে ধনসর্বস্ব না হলেও চলে।

সহপাঠীকে সম্মান করতে পয়সা লাগে না।

সহযাত্রীর উপস্থিতিকে মান্যতা দিতে পয়সা লাগে না।

সহকর্মীর লিঙ্গের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ নির্দিষ্ট কাজে তার দক্ষতা-এই মানসিকতাকে লালন করতেও পয়সা লাগে না বলেই তো মনে হয়।।


ছবি নিজস্ব

স্থান: অ্যান আরবর, মিশিগান


Comments

  1. ছবিটা আর লেখাটা মিলেমিশে আরো সুন্দর হয়েছে।
    পাশে থাকা আর সরে যাওয়াটাও তবে স্বাধীনতার উদযাপনের আর একটা অঙ্গ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কেবল উদযাপন নয়, ভুক্তভোগী হওয়ারও অঙ্গ বলে মনে হয়। মন্তব্যের জন্য বিশেষ ধন্যবাদ।

      Delete
  2. আসলে দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতেও 'কয়েক পুরুষ ' লাগে এ দেশে...

    ReplyDelete
    Replies
    1. বদল হতে হতে আবার পিছিয়ে না পড়ি এই কামনা।

      Delete

Post a Comment

Popular posts from this blog