শাস্তির নাম একাকিত্ব








অপরাধীর বোধ যদি হয় বিলীন, যদি সে অপরাধের সংস্পর্শ ছাড়া জীবন ধারণ না করতে পারে, তবে কেমন লাগে সেই মানুষকে দূর হতে দেখতে? জিমি ম্যাকগিল কখনই সততার বড়াই করতে চায়নি, সে সফল হতে চেয়েছে। কিন্তু তার প্রবল উচ্চাশার মধ্যে একটা বিরাট ফাটল আছে। সেই ফাটল ধরে এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে যেতে আলো-অন্ধকারের এক শৃঙ্গারোহণে সামিল হতে হয়। বিশ্বজনীন টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ব্রেকিং ব্যাড (Breaking Bad) (২০০৮-২০১৩)-এর এক বিস্ময়কর ছায়াপথ হল বেটার কল সল (Better Call Saul) (২০১৫-২০২২)। সল গুডম্যান সমস্যার সমাধান করতে জানে, মার্কিন বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার জন্য সদা উদগ্র সে। সে বঞ্চনা সয়ে এসেছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথ মসৃণ করে দিতে তাকে কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়নি, উপরন্তু আপন সহোদর আড়ালে বা প্রকাশ্যে তার অপরাগতা নিয়ে বার্তালাপ চালিয়েছে। তাই জিমি ম্যাকগিল (সলের পূর্বনাম) মরিয়া হয়ে ওঠে- সে বিশ্বাস করে তার সম্ভাবনা প্রবল, কিন্তু সম্ভাবনাকে দ্রুত সমাজগ্রাহ্য করে তুলতে গেলে সোজা পথ ছেড়ে নিতে হবে চোরাগলি। নৈতিকতার জীবিকায় অনুপ্রবেশ করবে বলে সে নিজেই হয় অনৈতিক; মাথা নুইয়ে আর লুকিয়ে চলা তার অভ্যাস হয়ে যায়।

ব্রেকিং ব্যাড-এর দুনিয়ায় আমার প্রবেশের মুহূর্তটা বেশ মনে পড়ে। সেমেস্টার-সঘন বিনিদ্র রাত তখন, আর আমি অপার খাতাবই-ফটোকপির সাহিত্যিক পাহাড় টপকে উঁকি মেরে শুধু ওয়াল্টার হোয়াইটের ড্রামাটিক কার্যকারিতায় মন দিয়ে ফেলি। ছাপোষা এক স্কুলশিক্ষক তার চরিত্রের এমন অন্ধকার অন্ত্যমিল নিয়ে মাটি ফুঁড়ে ওঠে যে সে নিজে, তার পরিবার, সহকর্মী কেউ দুঃস্বপ্নেও তেমনটা ভাবতে পারেনি। ওয়াল্টার দুর্দমনীয় গতিতে 'হাইজেনবার্গ' হয়ে ওঠাতেই আপন মোক্ষ খুঁজে নিতে চেয়েছিল। খারাপ মানুষ, ক্ষতিকর মানুষ হতে হতে সে আত্মবিশ্লেষণ করতে ভোলে, ক্ষমতার দম্ভে হয় অন্ধ। তাই সে যখন বলেছিল, "আই অ্যাম দ্য ডেঞ্জার", আমাদের বেমানান লাগেনি। ততক্ষণে আমরা ওয়াল্টারের তাড়নাকে চিনে ফেলেছি। ব্রেকিং ব্যাড-এর চরিত্রায়ণ এবং অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে, পার্শ্বচরিত্রের মাইক, হ্যাঙ্ক, সল, স্কাইলার, গাস ফ্রিং, মারি, মায় টেড বেনেকিকে নিয়ে পর্যন্ত পৃথক পৃথক উপগ্রহ তৈরী হতে পারে। নির্মাতারা জেসি পিঙ্কম্যান ও টডকে নিয়ে একটি ছবি ইতিমধ্যেই বানিয়েছেন (এল কামিনো)। বৃহত্তর আখ্যানের জন্য তাঁরা বেছে নিলেন সল-কে।

পিটার গৌল্ড ও ভিন্স গিলিঘান- এই দুই নির্মাতার বিশেষত্বই হল তাঁদের চরিত্রায়ণের অনিবর্চনীয় সক্ষমতা। বিনোদন জগতে হয়তো প্রতি ঘণ্টায় একটি করে সিনেমা, সিরিজ, আলেখ্য তৈরী হচ্ছে এখন। কিন্তু চরিত্রে মনোযোগী হতে পারেন ক'জনা? চরিত্রকে এমনভাবে চেনাতে পারেন কারা যাতে প্রত্যেকের কার্যকলাপের অস্বাভাবিকতা দেখেও দর্শক আমরা সেই সূক্ষ্মতাকে সহজে হৃদয়ঙ্গম করি? প্রতিটি দৃশ্যে জড়িয়ে থাকে ভাবমোক্ষণ।

সল প্রাথমিকভাবে এসেছিল ওয়াল্টারের সাম্রাজ্য রক্ষায় স্বচ্ছতার প্রচ্ছদ এঁকে দিতে। কিন্তু, সাম্রাজ্যবিস্তারের করাল রূপ যুগে যুগে তো একই, বিস্তারের তীব্র গতি ভালো-খারাপ, মূল্যবোধ কিচ্ছু মানে না। সে বাড়তে থাকে মানুষের বুকে ছুরি মেরে, তার ভিত শক্ত হয় নিঃশব্দে চলে যাওয়া কত প্রাণের রক্তরসে। তাই অপরাধকে লালন করা 'ব্যক্তি' সল-ও আত্মসম্মানের ধার ও ভার বইতে পারে না।

প্রকাশলগ্ন থেকে বেটার কল সল-এর নির্মাতাদ্বয় ঠিক করলেন, তিনরকম সময়পটে সাদা-কালো আর রঙিনের খেলাখেয়ায় এই আখ্যান গড়ে উঠবে। ব্রেকিং ব্যাড-এ দেখা গিয়েছিল, বাকচাতুরীতে ভরা সলের জীবনে সে-অর্থে নারী-সংসর্গ নেই। সে তার জন্য লালায়িতও নয়। আর, বেটার কল সল-এ তার পূর্বকথনে এলেন কিম ওয়েক্সলার- সাম্প্রতিককালের সমস্ত অভিনেত্রীর মধ্যে ওয়াইল্ড কার্ড নিয়ে সোচ্চার প্রবেশ; কী অদ্ভুত অভিনয় রিয়া সিহর্ণের! চোখের রেখায় যেন আস্ত ইতিহাস লেখা। ঠোঁটের কাঁপুনিতে লেগে থাকা বাস্তবের রূঢ়তা। হঠাৎ কেঁদে ওঠায় যেন ভিতরের সবচেয়ে গোপন যন্ত্রণার প্রকাশ। ধূসর যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে সে-ও পাল্টে যায়, পাল্টায় তার অভিব্যক্তি। নৈতিক যাপনে তার জীবনে ভয় ছিল না, অনৈতিকের গলিতে পা দিতেই তার ভয় পাওয়ার শুরু। রিয়া সিহর্ণ, নামটি থাকুক অভিনয়-সমীপে।

ব্রেকিং ব্যাড-এ ওয়াল্টারের যা নেই, সল গুডম্যান আর কিম ওয়েক্সলারের তা আছে। অনুতাপ। পাপের সংস্পর্শে আসার পর থেকেই কিমকে অনুতাপ তপ্ত করেছে বারবার। সে বুঝেছে, দুজন একসাথে থাকলে প্রচুর মানুষের ক্ষতিসাধন হবে- সলের অন্তরেও কোথাও ঠিকরে বেরিয়ে আসার মতো অনুতাপের বোধ ছিল। কিন্তু অনৈতিকতা তার সংবেদনকে ঢেকে ফেলেছে ততদিনে। এমনকি বাধ্য হয়ে নির্বাসনে থাকার সময়তেও সে পাপ হতে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। সুযোগ পেয়ে পুনরুজ্জীবিত হতে পারে না। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে নিষ্পাপ মানুষের ক্ষতি করে চলে, যারা তার উপর ভরসা করে, তাদের প্রত্যেককে ঠকাতে দ্বিধাবোধ করে না। 


অসম্ভব সুন্দর নির্মাণশৈলীর সাথে জীবনের শিক্ষাকে সাবলীলভাবে মিশিয়ে দেওয়ার প্রতিরূপ ব্রেকিং ব্যাড-এ ছিল, বেটার কল সল-এও আছে। নীতিকথার বুলির ঢঙে নেই, চরিত্রের পরিণতির সূত্রে গাঁথা আছে। শিল্পের অসংখ্য নিদর্শনে বারবার 'পোয়েটিক জাস্টিস' বা 'কাব্যিক বিচারের' কথা বলা হয়ে থাকে। অপরাধীকে কোনও না কোনওভাবে শাস্তি ভোগ করতেই হবে, তবেই তো শৈল্পিক সাম্য বজায় থাকবে, তবেই তো এই ঘৃণ্য সমাজবাস্তবতাতেও মানুষ বারবার শিল্পের কাছেই হাত পাতবে। ব্রেকিং ব্যাড, এল কামিনো, বেটার কল সল- এরা প্রত্যেকেই সেই কাব্যিক বিচারের রূপটিকে বিচারবিভাগীয় বা মৃত্যুকালীন কষ্টে দেখায় না কেবল। গিলিঘান ও গৌল্ডের দর্শনে মানুষের সর্বোচ্চ শাস্তির নাম একাকিত্ব। যে কঠোর একাকিত্বে আর প্রায়শ্চিত্তের জায়গা নেই। ওয়াল্টার হোয়াইট বরফবহুল নির্জন প্রদেশে সেই খাবার-ওষুধ নিয়ে আসা লোকটিকে আর এক ঘণ্টা থাকার জন্য বেশী টাকা দিত, অনেক কষ্টে ছেলেকে ফোনে ধরে মিনতি করার সময় ছেলে বলেছিল, "আমি খালি চাই তুমি মরে যাও।" সল শেষবারের মতো কিমকে ফোন করতে গিয়ে খুচরো পেনি হাতড়াতে থাকে, নিঃশব্দতার মধ্যেও ফোনটা আরেকটু ধরে রাখতে চায়, আর একটু, যতক্ষণ রাখা যায়।



আখ্যানের একেবারে শেষপ্রান্তে একবার ওয়াল্টার আর সলের পূর্বমিলন দেখানো হয়। দুজনকেই পুলিশ পাগলের মতো খুঁজছে তখন। সল ওয়াল্টারকে জিজ্ঞাসা করে, "একটা টাইম-মেশিনে চড়তে পেলে তুমি কোন্ সময়টাতে ফিরতে চাইবে?" 


ওয়াল্টার বিরক্তি-সহায়ে প্রত্যুত্তর দেয়, "ও, তুমি জানতে চাইছ আমার কোনও অনুতাপ আছে কিনা?"


বেটার কল সলের উপদেশ মেনে সলের চেম্বারে আর লাইন পড়বে না। সিরিজ শেষ, লাইন পড়লেও আমাদের জানা হবে না। শুধু মনে রেখে দেওয়া যাবে এই কথাটি- সংশোধনের আশা কখনও কখনও উচ্চাকাঙ্ক্ষাও বটে। তার চেয়ে অনৈতিক চোরাগলির চটজলদি ত্রিফলা আলোর নীচে আবছা আঁধারটুকু অনেকের কাছে আরামের। আমরা, চোরাগলিতে ঢুকতে পারি ঠিক, কিন্তু, ঐ অমোঘ একাকিত্বের সাথে যুঝতে পারব তো??



ছবিসূত্র: https://9to5fortnite.com


Comments

Popular posts from this blog