মেইন রোপ


 

ভাগ্যের চাকা জীবনে কারোর ঘোরে, কারোর থাকে একেবারে স্থির। কেউ ঘোরানোর চেষ্টায় চরম নিমজ্জিত থাকে, আশপাশকে ঠিক করে দেখা হয়ে ওঠে না তার। মানুষের আয়ুষ্কালে ছোটবেলাটুকুর কিয়দংশ দারুণ ইতিবাকতায় কাটে, হয়তো সারা জীবনের সবচেয়ে ইতিবাচক ঐ পরিসর। যখন স্বপ্ন দেখার সূচনা, কেবল সূচনা নয়, যখন সব স্বপ্নকেই সম্ভবপর লাগে। সেই ক্ষণিকের তরে পথের কোনও কাঁটার কথা ধার্য্য হয় না, প্রতিবন্ধক বলে কিচ্ছুটি নাড়া দেয় না, মনে হয়, করেই ছাড়ব। শর্তবিহীনভাবে মানুষের পক্ষে সামান্যটুকু করাটা অসম্ভাব্যের কোঠায় বলেই বোধহয়, শর্তবিহীনতার এই তীব্র তাড়নাকে অন্তর থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে দেখতে মন চায় না। 

 

স্বপ্ন দেখার সেই স্বপ্নকাল কাটলে পরে তফাত হয় স্পষ্ট। অপর লোকে আমার থেকে কী চায়, অপরের প্রত্যাশা মেটাতে গিয়ে, সমাজের প্রত্যাশার সম্পূর্ণতা প্রাপ্তির পথে নিজের অকুতোভয় সত্তার বিলোপ ঘটে। তখন মানুষ নিজের সঙ্গে মোটামুটি একটা সমঝোতা করে নেয়, দিগন্তের সীমাকে ঘরের চৌকাঠে নিয়ে এসে ক্ষান্ত হয়। আমি যখন হোস্টেলে থাকতে গিয়েছিলাম, তখন আমার জীবনে সহাবস্থানের কোনও ধারণা হয়নি, জীবনটা যে নেহাত সহজ নয় সেকথা অল্প অল্প করে বোঝার শুরুতেই একত্রবাসের অভিজ্ঞতা হল। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও যে কিছু মানুষের সঙ্গে অনেকগুলো বছর থাকা যায়, একথা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি না হওয়া অবধি বিশ্বাস করা বড় কঠিন। আসলে, আমাদের একটা জীবনে নিজের অভিজ্ঞতা ছাড়া পরোক্ষ কিছুকেই কি আর সম্পূর্ণত ভরসা হয়? এমনকি, মনোজগতে বিচরণ করতে করতে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটার মন নিয়েও কতটা ভাবা হয়? এই ভাবনার বহিরায়ণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই জীবনশিক্ষা লুকিয়ে আছে। নিজেকে ছেড়ে, আত্মকে ছাপিয়ে অপরকে জায়গা দেওয়া।


রজত কপূরের পরিচালনায় একটি হিন্দি ছবি দেখেছিলাম কয়েক বছর আগে, 'আঁখো দেখি' (২০১৩)। হিন্দিভাষী ছবির বাণিজ্যিক দিকটি যে হাতেগোনা কয়েকটি ছবিতে ঔদ্ধত্য দেখায় না, এ ছিল তার মধ্যে শীর্ষপন্থী। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র (সঞ্জয় মিশ্র) হঠাৎ একদিন ঠিক করে, সে নিজের চোখে না দেখে কিচ্ছু বিশ্বাস করবে না। যা যা আছে বলে 'ধরে' নেওয়া, কাল্পনিক ভয়, দুঃখ, হিংসা, আনন্দের গোটা কাঠামোটাকেই সে বর্জন করবে, কেবলমাত্র নিজেকেই মানবে সর্বোত্তম সাক্ষী। ছবির এই সূত্রটির পাশাপাশি অনাবিল সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে চরিত্রের আর্থিক স্থিতি বা সামাজিক পরিচয়। সে সামান্য এক কর্মচারী, নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়িতে বউ-মেয়ে নিয়ে বাস। ভাইয়ের পরিবার সাথে থাকত, তারাও একদিন আলাদা হয়ে যায়। সে বিরাট আত্মজ্ঞানে ধনী, অগাধ বিফল জ্ঞান, তেমনটাও নয়। পূর্বস্থিত কোনও বোঝা-বিহিতভাবেই, অনেক বই না পড়েও সে আপন-অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশী মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কখনও হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যায়, বাড়ির লোক, বান্ধবসমিতি, কেউ ঠাহর করতে পারে না কী হচ্ছে। এমন তো তারা কেউ আগে দেখেনি।

 

নতুন কিছু, অপ্রচলিত কিছুকে সমাজ সহজে মেনে নেয় না একথা পরীক্ষিত সত্য। এই না-মানার মধ্যে যারা প্রবল ঘষামাজায় সৌভাগ্য সহায়ে সফল হয়ে বেরিয়ে আসে, সমাজ আবার তাকে নিয়েই মাতামাতি করে। অথচ প্রাথমিকভাবে আমরাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম সে গতে বাঁধা নয় বলে। তবে, এ নিয়ে অভিযোগ করে মুখ গোমড়া রাখার চেয়ে তাকে উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর হল বেশী ফলপ্রসূ। সেই 'আঁখো দেখি'-র শিক্ষা আমাকেও বিশ্বাস করিয়েছিল, যা নিজে স্বহস্তে অনুভব করছি, তার চেয়ে সত্যতর আর কিছু নেই। কিন্তু, সত্য কী? আমাদের একালের সত্যানুসন্ধান আর উপনিষদকালীন সত্যধর্মিতা এক নয়। আমরা রয়েছি সত্যোত্তর যুগে, Post Truth নিয়ে আমাদের কারবার। সত্যকে আমরা নিজেদের মতো বদলাই, তাকেই সত্য বলে মানি যা আমাদের স্বার্থকে চরিতার্থ করে, তাকে অগ্রাধিকার দিই যা আমাদের স্ব-স্ব ভাষ্যের সঙ্গে দ্বিরুক্তি না করে তাকে চুপচাপ মেনে নেয়। কিন্তু, অনাদি সত্যের কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নেওয়ার দায় নেই। বরং সে অটুট সত্তা ধরে রাখবে মানুষকে বোঝাতে যে, আদতে মানুষের নিজেকে যথেচ্ছাচারী ভাবার কোনও অধিকার নেই। কারণ সে নিজে অতি ক্ষুদ্র।

যাক গে, শৈশবে আকারে ক্ষুদ্রতা নিয়ে ভাবনা শুরু হতে হতেই হোস্টেলে পা রেখে দিলাম। মিলেমিশে থাকা কেমন হয় তা শেখার পাশাপাশি সফলভাবে থাকতেও হবে৷ অনেকগুলো বছর, অনেকগুলো প্রাণ বড় হয়ে উঠবে। হঠাৎ অঘটনে আপন কাউকে পাওয়া যাবে না। যাদের পাশে পাওয়া গেল, তারা হয়ে গেল আপন। এমন করে অযাচিতে পাওয়া আপনজন প্রাপ্তিতে ভাগ্য অবশ্য লাগে। সে আমি নিজে, স্বপ্রাণে, স্বচক্ষে জেনেছি। তাই বুঝেছি। সেই বোঝার সঙ্গে বড়বেলার বোঝাকে মিলিয়ে আমি জেনেছি আসলে জীবনের কাছ থেকে ইতিমধ্যে ফলানো ফসল পাওয়ার প্রত্যাশা বৃথা। ব্রহ্মাণ্ড শুধুই মানুষের জন্য তৈরী হয়নি, তাই কর্ষণ মানুষকে করতেই হবে। সমস্তটা মানবের অনুকূলে হবে এমন দিব্যিও কেউ দেয়নি। কর্মযোগে নিজের সবটা দেওয়া আর ধ্যানযোগে প্রশান্তি সন্ধান- এ এক পথ হতে পারে। পথ আরও অনেক আছে। নিশ্চিন্তি, অনিশ্চিন্তির নানাবিধ পথ। রহস্যের পানে চলো মন, কিন্তু চলো সচেতনে।

 

হোস্টেল জীবনে আমাদের দিনলিপিতে "মেইন রোপ"-এর বিশেষ স্থান ছিল। মেইন রোপ ঘরের মাঝবরাবর টানটান করে টাঙানো থাকবে। সবার মশারির অন্তত একদিক এসে সেখানে জুড়বে। নিশিকাল বাদে সেই দড়িটাই আমাদের ঘরায়িত ভলিবল, ক্রিকেট, ক্যাচ-ক্যাচের মেইন অতিক্রম্য রেখা হয়ে উঠত। আয়োজন যেটারই থাক, মেইন রোপে গলদ থাকলে মশারি টাঙানো সহ কোনওটাই ঠিক করে হত না।

 

সচেতনে এ ধরার সংকুল, দুঃখসিক্ত, টুকরোসুখের পথ পেরোতে হবে। শুধু শরীরের, মনের মাঝবরাবর যে "মেইন রোপ"-টি গেছে, তাকে সিধে রাখা, মজবুত রাখা খুব জরুরি। ওই দড়িটা আমরা নিজে হাতে টাঙাতে পারি। বাকিটা হাতের বাইরে।।




       ছবিঋণ: কুন্দন মণ্ডল, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের কোনো এক হোস্টেল ঘরের জানালা থেকে।

           

Comments

Popular posts from this blog