'কাব্যে উপেক্ষিতা', তাই উপেক্ষিতার সামান্য কাব্য
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর স্ত্রী, এই তাঁর পরিচয়।
ভারতবর্ষের ইতিহাস জুড়ে মহত্ত্বের যত আলেখ্য আছে কস্তুরবা সেখানে উচ্চারিত একেবারে
যে হন না তা নয়, কিন্তু হন ঐ একমাত্র পরিচয়ের ভিত্তিতেই। তাই কয়েক বছর আগে ইন্দোরের
কস্তুরবা আশ্রমে গান্ধী রিসার্চ ফাউণ্ডেশনের জনৈক কর্মী যখন জীর্ণ, প্রায় অপাঠযোগ্য
শতাধিক পাতার একটা দিনপঞ্জি পেলেন তখন সুনিবিষ্ট গবেষক, পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যারাও
এমনকি বিশ্বাস করতে পারেননি যে সেটি কস্তুরবার ডায়েরি। কস্তুরবা পড়তে খানিক জানলেও
ডায়েরি লিখতে জানতেন একথা সকলের কাছে প্রথমে ধাক্কা হিসাবেই লাগে। তারপর জানা যায়,
এ লেখা তাঁরই। এই দিনপঞ্জি-সম কয়েক ছত্রই বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাঁকে একজন একক পরিচিতি
সম্পন্ন সত্যাগ্রহী করে তোলে। কস্তুরবা গান্ধীর ডায়েরির ভাষা হয় তাঁর আত্ম-মুক্তির
পথ।
হঠাৎ পাওয়া এই ডায়েরির আপাতদৃষ্টিতে সামান্য দিনলিপি।
নাতিদীর্ঘ। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৩ গান্ধীজিকে ছাড়া চরম একাকিত্বের সময়তে কখনও জেলে কখনও বা
বাড়িতে থাকাকালীন কস্তুরবা লিখে রাখছেন কখন প্রার্থনা করলেন, কতক্ষণ চরকা কাটলেন, কতজন
তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন। গুজরাটি ভাষায় কাঠিয়াওয়াড়ি টানে ক্ষেত্রবিশেষে ভুল সহ লিখলেও
এ তাঁর নিজের হাতে লেখা। স্বামীর মহত্ত্বের চাপে যে হাতের লেখা খুব অল্পই জনসমক্ষে
এসেছে। ইংরাজী অনুবাদক তাই লেখার সারল্য, ভুলের ধাঁচকে অক্ষত রাখতে সজ্ঞানে অনুবাদেও
ভুল রাখেন। দ্য লস্ট ডায়েরি অফ কস্তুর, মাই বা-র (২০২২) প্রতি পৃষ্ঠায় রয়েছে
রোমাঞ্চ, পৃষ্ঠা শেষে মনে হচ্ছে, এই তো আগামী পাতায় আরও কিছু থাকবে, বিশেষ কিছু। সাহিত্যের
পরিভাষায় প্রত্যাশার দিগন্ত (Horizon of Expectation) তবু ছোঁয়া হয় না। বক্তব্য থাকে
নিস্তরঙ্গ, অনেক সময় নিরর্থকও। কিন্তু, ডায়েরি তো বটে, কথক সেখানে কি বলবেন কতটা বলবেন
তা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ১৭ জুন ১৯৩৩ তারিখের লেখাটুকু যেমন: “ভোর ৪টেয়
প্রার্থনা। গীতা পড়া হল। সকালের পুজো-আচ্চা হল। বাপুজিকে খেতে দিলাম, বাসন মাজলাম,
ওঁর পাশে বসলাম। ৩০০ গাছা সুতো কাটা হল”। এমন করেই তাঁর বেশীরভাগ দিন যায়। কখনও বাপুজির
সাথে থাকার, তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়, বেশীরভাগ দিনই হয় না। দিনলিপির মধ্যিখানে আড়াল
করেই মাঝে মধ্যে লেখেন, “সময় এত তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে কিছু বোঝার আগেই…”
১৯৩০-এ গান্ধীজি
সবরবতী আশ্রম ছেড়ে যেতে উদ্যত হলেন। স্ত্রীকে জানালেন, স্বরাজ অর্জন না করা অবধি তিনি
আর ফিরতে ইচ্ছুক নন। পরবর্তী কিছু বছরের জন্য কস্তুরবা আবার একা হয়ে গেলেন। দাম্পত্যের
নানা পরিসরে তাঁকে স্বামীকে ছাড়া থাকতে হয়েছে। তাঁর ‘মহাত্মা’ স্বামীর অপারগ থেকে পারঙ্গম
হয়ে ওঠার যাত্রাপথের সবচেয়ে সৎ সাক্ষী তিনি। স্বামীর আদর্শের সাথে একাত্ম হতে হতে কস্তুরবা
কি ডায়েরির পাতায় নিজেকেই খুঁজে দেখতে চেয়েছিলেন? মনে পড়ে যায় রাসসুন্দরী দেবীর কথা,
চৈতন্যভাগবতের পুঁথি সহায় করে তিনি অক্ষর চিনতে শেখেন, খুঁজে পান নিজেকে, লেখেন আমার
জীবন নামে আত্মজীবনী। অদ্ভুত বিনয়ের সাথে লেখা হলেও রাসসুন্দরী সেই লেখায় দৃপ্তভাবে
জানিয়ে দিয়েছিলেন ঊনিশ শতকের বাঙালী অন্তেবাসিনী নারীর এই ‘সামান্য’ সংগ্রামের যথেষ্ট
সামাজিক মূল্য রয়েছে। কস্তুরবা স্বতন্ত্র চোখে ভারতবর্ষের বিশাল রাজনৈতিক প্রেক্ষিত
চাক্ষুষ করছিলেন, দেখছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গী এই বিরাট যজ্ঞের অন্যতম মূল হোতা।
অনুবাদক তুষার গান্ধী প্রথমে ডায়েরির অকৃত্রিম
পৃষ্ঠাগুলির ছবি দিয়েছেন, গুজরাটি মুদ্রণে সেটি তুলে ধরার পর ইংরাজীতে অনুবাদ করেছেন।
ফলত, পাঠকের কাছে বিবিধ উপায় আছে মূল লেখার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার। সে কস্তুরবার হাতের
লেখা যেমন দেখতে পারে, তেমনই পারে সহজ বোধ থেকে ‘মানুষ’ গান্ধীর অস্তিত্বকে অনুধাবন
করতে। সর্বোপরি, কস্তুরবার নিজস্ব পরিচিতিকে ক্ষণিকের জন্য হলেও অনুধাবন করতে।
ভারতবর্ষ বীরপূজার দেশ; নায়কের জন্ম ও অপমৃত্যুর
ক্রমিক সমন্বয়ে রচিত হয়েছে তার মহাকাব্যিক ওঠা-নামা। মহাত্মা গান্ধী নামটি সেই বীরপূজার
এক অবিসংবাদী নৈবেদ্য। কস্তুরবার দিনপঞ্জিতে ব্যক্তিগত কষ্টকে কখনও বড় করে দেখার নিদর্শন
মেলে না, একথাও ভাষায় বলা হয়ে ওঠে না যে, স্বামীর অনুপস্থিতি তাঁকে পীড়া দেয়। তবু সব
না-বলা কথার রেশ ঐ সামান্য কয়েক শব্দে যেন অনুরণিত হয়। অনুবাদক বইয়ের একটি অংশে গান্ধী-কস্তুরবার
জীবনের বেশ কিছু ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়ে আংশিক জীবনী লিখেছেন, তা যেন ডায়েরির দাবি মেনেই
লেখা। জেলে থাকাকালীন কস্তুরবা গান্ধীজির স্ত্রী বলে তেমন আলাদা খাতির পাননি, তিনি
নিজেও চাননি। ব্রিটিশ সরকার বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে (গান্ধীজি হাসপাতালে থাকলে) কেবল আত্মসমানার্থে
ছাড় দিয়েছিল তাঁকে।
কস্তুরবা
জীবন জুড়ে অপ্রাপ্তির অভিযোগ করেননি, শেষবেলায় এসে হয়তো তাঁর মনে পড়ত দক্ষিণ আফ্রিকার
সেই প্রারম্ভিক দিনগুলো। যখন মোহন নিজের পরিচিতি ক্রমশ দৃঢ় করছেন, বাড়িতে ক্রমাগত লোকজন
আসছে, কেউ প্রবল সমাদর করছে, কেউ বা গালমন্দ করতে দ্বিধা করছে না। আর তিনি গৃহকোণ সামলাচ্ছেন,
রোজ মন থেকে সবটা মানতে পারছেন না, অন্তরালের পৃষ্ঠপোষক হয়ে থাকতে থাকতে কখনও তিনি
ক্লান্ত। কিন্তু হতাশ্বাসী নন। স্বামীর গন্তব্য, দেশের স্থিতি, বিশ্ব রাজনীতি সবটাই
সমাপতিত হচ্ছে তাঁর জীবনে। ইতিহাস বইয়ে জায়গা না পাওয়া, মাহাত্ম্যের কাছে তাঁর সূক্ষ্ম
সুনিবিড় উপস্থিতির জানান দেওয়ার জন্য কস্তুরবার ডায়েরিটা আদতেই খুব দরকার ছিল মনে হয়।
সাহিত্যিক ইতিহাস মানুষের ভাষ্যকে এমন করেই তো প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের অংশ করে তোলে।
যুদ্ধের সাল, পরিসংখ্যান, ব্যাপ্তি জানাতে গিয়ে ইতিহাস একক মানুষকে ধর্তব্যে আনতে ভুলে
যায়। মহাত্মা গান্ধীর প্রবল জীবনের ছবি আঁকতে গিয়ে ভুলিয়ে দেয় কস্তুরবা’দের। ধুলোর
আড়াল থেকে তখন আরেকটা পৃষ্ঠা হঠাৎ দৃশ্যমান হয়। সেখানে লেখা থাকে, “সকালের প্রার্থনা
সারলাম। সকাল সাড়ে ছ’টায় আমাদের ট্রেন দাদার পৌঁছল। যমুনাবেন এসেছেন আমাকে নিতে … হরিলাল
আমার সাথে। বাপুজি চোখের দেখা দেখে আনন্দ হল, কাঁদিনি কিন্তু। যদিও বাপুকে এখন বড় রুগ্ন
লাগে”… (১৫ মে ১৯৩৩)
তথ্যঋণ: তুষার গান্ধী। দ্য লস্ট ডায়েরি অফ কস্তুর,
মাই বা। হার্পার কলিন্স, ২০২২।
ছবিসূত্র: মূল বইয়ের প্রচ্ছদ। দ্য হিন্দু দৈনিক পত্রিকা

Comments
Post a Comment